"বেদ পরিচিত" পর্ব :০২

"বেদ পরিচিত"

তৃতীয় পক্ষ বেদকে 'ঈশ্বরীয়' বলেন। তাঁদের মতে প্রত্যেক সৃষ্টির প্রথমে স্বচ্ছ শুদ্ধ হৃদয় মানবের হৃদয়ে ঈশ্বর বেদবাণীর প্রেরণা দান করেন। যে সব মানবের আত্মা পূর্ব সৃষ্টিতে শুভকর্ম দ্বারা শুদ্ধ থাকে, তাঁদের হৃদয়ই বেদবাণীর প্রেরণা লাভ করে। ঈশ্বরীয় পক্ষ বলেন-চন্দ্র, সূর্য, পৃথিবী, অন্তরিক্ষ ও দ্যুলোকাদি যেমন পূর্ব কল্প অনুযায়ী এই কল্পে রচিত হয়েছে; তেমন পূর্ব কল্পে বেদ যেভাবে প্রকট হয়েছিল, এই কল্পেও সেভাবেই প্রকট হয়েছে। তাঁদের মতে বেদের মন্ত্র, ভাষ্য ও অর্থ প্রত্যেক কল্পে একরূপভাবেই চলে আসছে। আর্ষপক্ষ জ্ঞানের একরসত্ব স্বীকার করেন, আর ঈশ্বরীয় পক্ষ ভাষা, শব্দ, মন্ত্র ও জ্ঞানের একরসত্ব স্বীকার করেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ বলেন-কল্পের প্রথমে ব্রহ্মার হৃদয়ে বেদ অর্পিত হয়েছিল এবং ব্রহ্মার নিকট হতে শিষ্য পরম্পরায় বেদ মানবের মধ্যে প্রচারিত হয়েছে। কারোর মতে, অগ্নি, বায়ু, আদিত্য, অঙ্গিরা এই চারজন ঋষির হৃদয়ে চারিবেদ অর্পিত হয়েছিল। এই চারজন ঋষি হতেই শিষ্যপরম্পরার বেদ মানবজাতির মধ্যে প্রচারিত হয়েছে। তাঁদের মতে, বেদ 'ঈশ্বরীয়' ও নিত্য। কল্পের প্রারম্ভে ঋষিগণ বেদের প্রকাশ করেছিলেন। বেদ ঋষিদের নিজস্ব বস্তু নয়, তাঁরা বেদের রচয়িতা নন, তাঁরা বেদের দ্রষ্টা। উত্তর মীমাংসা বা বেদান্ত দর্শন এই ঈশ্বরীয় পক্ষ সমর্থন করেছেন। উত্তর মীমাংসার মতে, বেদ দিব্যবাক্।

চতুর্থ পক্ষ বেদকে 'অপৌরুষেয়' বলেন। তাঁরা বেদের উৎপত্তি স্বীকার করেন না, অভিব্যক্তি স্বীকার করেন। মীমাংসা দর্শনকার জৈমিনীর মতে শব্দ নিত্য। নিত্য পদার্থ অপরিণামী ও প্রবাহ ভেদে দ্বিবিধ। যার স্বরূপ বা গল্পের কোনো পরিবর্তন হয় না, তা 'অপরিণামী-নিত্য' এবং যা নানা রূপান্তরের মধ্যেও নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করে, তা 'প্রবাহ-নিত্য'। পরমাত্মা 'অপরিণামী নিত্য'। তিনি সর্বদাই এক রস থাকেন, কিন্তু প্রকৃতি প্রবাহ নিত্য। সৃষ্টি, স্থিতি, প্রলয়ের চক্রে প্রকৃতি নানা পরিণাম প্রাপ্ত হয়, কিন্তু রূপে তা নিত্য।
বেদ শব্দময়, মহর্ষি জৈমিনি শব্দকে নিত্য বলেছেন। অ-আ-ক-খ প্রভৃতি বর্ণের উৎপত্তি হয় না। বর্ণসমূহের কেবল অভিব্যক্তি সম্ভব। স্বর্ণ হতে অলঙ্কারের উৎপত্তি হয়, কারণ অলঙ্কার পূর্বে ছিল না। অন্ধকার গৃহে প্রদীপের সাহায্যে অলঙ্কার দৃষ্ট হয়। এখানে অলঙ্কারের অস্তিত্ব পূর্বেই ছিল, তবে মাত্র প্রদীপের মাধ্যমে তার অভিব্যক্তি হল। কোনো বস্তুর অভিব্যক্তির পূর্বে তার উৎপত্তি হয়, উৎপত্তির পূর্বে অভিব্যক্তি হয় না। ক, খ, গ, ঘ প্রভৃতিকে অক্ষর বলে, কেননা তাদের ক্ষরণ বা ধ্বংস হয় না আর জগতের প্রত্যেক স্থানেই বর্তমান রয়েছে। কণ্ঠ, তালু, দন্ত প্রভৃতি স্থান অক্ষরকে উৎপাদন করে না, ব্যক্ত করে মাত্র। অক্ষরসমষ্টি মিলিত হয়ে পদ ও শব্দসমষ্টি হয়। সেগুলো কোনো অর্থ প্রকাশ করতে মিলিত হয়ে বাক্য গঠন করে অক্ষর বা বর্ণ কোনো পুরুষবিশেষের রচিত নয় বলে অপৌরুষেয়। বর্ণ অপৌরুষেয় হলেও বিভিন্ন অর্থের সংকেত অনুসারে, সেগুলো মিলিত হয়ে পদ গঠন করে এবং বিভিন্ন পদ ও অর্থের সংকেতানুসারে মিলিত হয়ে বাক্য গঠন করে। মনুষ্যকৃত গ্রন্থে এই সব বর্ণ ও বাক্যের সাহায্যে অর্থের সংকেত প্রকাশ করা হয়েছে। বেদ ও মনুষ্যকৃত গ্রন্থে পার্থক্য এই স্থানে যে, মনুষ্যকৃত গ্রন্থের বর্ণ বা অক্ষর অপৌরুষেয় হলেও পদ বা বাক্য সমষ্টি পৌরুষেয়। কিন্তু বেদের পদ, শব্দার্থ, বাক্য, বাক্যার্থ সবই অপৌরুষেয়। বেদমন্ত্রকে কোনো পুরুষবিশেষ রচনা করেন নি। বেদ বণী নির্দিষ্ট আকারে অনাদিকাল হতে চলে আসছে। ঋষিগণ নিজের তপোবলে এই নিত্য বেদকে দর্শন করেন ও তাহাকে অভিব্যক্ত করেন। বেদমন্ত্রের অর্থকেও তাঁরা দর্শন করেন। বেদ শব্দার্থ সম্বন্ধযুক্ত হয়েই অনাদিরূপে অবস্থান করে। ঋষিগণ যুগে যুগে বেদ বাণী প্রকাশ করেন। জৈমিনি শব্দের নিত্যতা প্রমাণ করেই বেদের নিত্যত্ব সিদ্ধ করিয়াছেন এবং শব্দের অনিত্যত্ব খণ্ডন করেছেন

পর্ব- ০২
তথ্যসূত্র: বেদ-পরিচয় (বই)
প্রচারে: VEDA

#veda #we_are_veda

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ