"বেদ পরিচিতি"
বেদ আর্য জাতির ধর্মগ্রন্থ এবং সমগ্র মানবের আদি জ্ঞানভাণ্ডার। জগতের যাবতীয় ধর্ম বেদ হতেই জন্মলাভ করেছে, বিশ্বের যাবতীয় ভাষা বৈদিক ভাষা হতেই নিঃসৃত। পৃথিবীর যে কোনো মানব তার শিক্ষা সভ্যতা ও ভাষার ইতিহাস পাঠ করতে ইচ্ছা করলে, তাকে বেদেরই শরণাপন্ন হতে হয়। বেদের মধ্যে যে অক্ষর জ্ঞান সম্পদ স্তুপীকৃত রয়েছে, তা আহরণের জন্য যুগে যুগে সব দেশের শ্রেষ্ঠ মনীষীরা আমরণ পরিশ্রম করেছেন। সে পরিশ্রম এখনও শেষ হয় নি। পৃথিবীর নানা জাতি নানা ভাষায় ও নানা ভাবে আজও বেদের গবেষণা করছে। বেদের ওপর পণ্ডিতগণের শ্রদ্ধা থাকলেও সকলে বেদকে একভাবে দেখে না। যাঁরা বেদ-বিষয়ে গবেষণা করেছেন, তাঁদেরকে আমরা চারভাগে ভাগ করতে পারি। একদল বেদকে 'পৌরুষেয়', দ্বিতীয় দল 'আর্ষ', তৃতীয় দল 'ঈশ্বরীয়' এবং চতুর্থ দল 'অপৌরুষেয়' বলেন।
পাশ্চাত্য পণ্ডিতেরা বেদকে 'পৌরুষেয়' বলেন। তাঁদের মতে বেদ মানবের রচনা মনে করিয়াই তাঁহারা বেদকে পুরুষ বিশেষের রচিত বা "পৌরুষেয়" বলেন। তাঁদের মতে, বেদ মানব মস্তিষ্কের চরম উৎকর্ষ। ঋষিগণকেই তাঁরা বেদ মন্ত্রের রচয়িতা ও উপদেষ্টা মনে করেন। বেদ মানব জাতির গ্রন্থভাণ্ডারে প্রাচীনতম গ্রন্থ, তা তাঁরা মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করেন। বেদকে কেন্দ্র করেই ব্রাহ্মণ, > আরণ্যক ও উপনিষদ্ গ্রন্থ রচিত হয়েছে। তাঁরা এই সব সাহিত্যরাজির মধ্য হতে প্রাচীন আর্য জাতির ইতিহাস উদ্ধার করতে সচেষ্ট রয়েছেন। প্রাচীন পৃথিবীর ভৌগোলিক বৃত্তান্তও তাঁরা বেদ হতেই উদ্ধার করতে প্রয়াস পেয়েছেন। পৌরুষেয়বাদী এই সব দেশী ও বিদেশী পণ্ডিত বেদকে উপাদেয় গ্রন্থ ও * গবেষণার ক্ষেত্র মনে করে শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখেছেন।
দ্বিতীয় পক্ষ বেদকে 'আর্ষ' বলেন। প্রাচীনকাল হতেই তাঁরা ঘোষণা করে এ আসছেন যে, বেদ ঋষিপ্রণীত। স্বছ-হৃদয়, সত্যাচারী, শুদ্ধাত্মা ঋষিরা পূণ্যবলে ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ বিষয়ের যে সাক্ষাৎ জ্ঞান দর্শন করেছিলেন, তা-ই বেদ মন্ত্রের সমষ্টি। তাঁদের মতে, বেদের বিষয়ীভূত জ্ঞান সর্বদাই একরস থাকে। কল্প কল্পান্তরেও এই জ্ঞানের পরিবর্তন হয় না। এই জ্ঞান মানব জাতির উন্নতির চির সহায়। এক কথায় আর্ষবাদীরা বেদ মন্ত্রের ভাষাকে ঋষিদের নিজস্ব মনে করেন,কিন্তু বেদমন্ত্রের জ্ঞানকে ঈশ্বরের নিজস্ব মনে করেন। তাঁদের মতে, বেদান্তর্গত ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষ প্রাপ্তির নিয়ম অপৌরুষেয় বা ঈশ্বরীয়। পরমেশ্বর বেদকে উৎপন্ন করেছেন এবং তা ঋষিদের ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। পৌরুষেয় ও আর্থ পক্ষ উভয়ের মতেই বেদমন্ত্র একসঙ্গে রচিত হয় নি। বেদমন্ত্র রচনা করতে ঋষিদের কয়েক পুরুষ অতিবাহিত হয়েছিল। তারপর ব্রাহ্মণ, আরণ্যক, উপনিষদ রচিত হয়েছে। আর্ষবাদীদের মতে, উপনিষদ্ রচিত হবার সঙ্গে সঙ্গেই ঋষিদের যুগ শেষ হয়েছে। তাঁদের মতে বেদের মধ্যে কল্পিত উপাখ্যানও আছে। বেদের ভাষা ঋষিদের নিজের বলেই তাঁরা বেদকে 'আর্ষ' বলে থাকেন।
পর্ব : ০১
তথ্য সূত্র : বেদ পরিচয় [বই]
প্রচারে:- VEDA

0 মন্তব্যসমূহ