"মৃত্যুতেই শত্রুতার সমাপ্তি"


"মৃত্যুতেই শত্রুতার সমাপ্তি" 

নমস্কার সকল অমৃতের সন্তানগণ! বৈদিক অমৃত জ্ঞান প্রচারে নিয়োজিত VEDA পেজে স্বাগতম। 

​জীবনের এই রঙ্গমঞ্চে মনুষ্য যখন পারস্পরিক দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়, তখন তার দম্ভ আর ক্রোধ  গগনচুম্বী মনে হতে পারে। কিন্তু মহাকালের অমোঘ নিয়মে যখন মৃত্যুর শীতল পরশ নামে, তখন সেই সমস্ত উত্তাল ঘৃণা এক নিমেষে স্তব্ধ হয়ে যায়। কারণ, মৃত্যুতে সকল দ্বন্দ্বের সমাপ্তি ঘটে। এই বাক্যে জীবনের অসারতা এবং মানবিকতার এক চূড়ান্ত সত্য চির ভাস্বর হয়ে উঠে। 

​ইতিহাস সাক্ষী আছে, যে তলোয়ার যুদ্ধের ময়দানে একে অপরকে বিদ্ধ করতে উন্মত্ত ছিল, কবরের নিস্তব্ধতায় তারা আজ সমান্তরালভাবে শায়িত। মৃত্যু যেন এক মহান সমন্বয়কারী, যা জীবনের সমস্ত জটিল সমীকরণকে শূন্যে মিলিয়ে দেয়। মানুষের হৃদয়ে পুষে রাখা বছরের পর বছর ক্ষোভ, অপমানের জ্বালা আর প্রতিহিংসার দাবানল এক নিথর দেহের সামনে এসে লজ্জিত মস্তকে ফিরে যায়।

​যেখানে নিঃশ্বাস নেই, সেখানে অধিকারের লড়াই অর্থহীন। যেখানে স্পন্দন নেই, সেখানে শ্রেষ্ঠত্বের দম্ভ এক করুণ প্রহসন মাত্র। তাই মৃত্যু কেবল প্রাণের স্পন্দন থামিয়ে দেয় না, বরং তা অহংকারের দেয়াল ভেঙে দিয়ে মানুষের জন্য রেখে যায় এক পরম শিক্ষা, ক্ষমা এবং শোকের একীভূত মোহনায় দাঁড়িয়ে সব বৈরিতা তুচ্ছ হয়ে যায়।

জীবনের এই চিরন্তন সত্য বাল্মিকী রামায়ণে নিগূঢ় ব্যাখ্যায় উপস্থাপিত হয়েছে। বাল্মিকী রামায়ণ ন্যায়-অন্যায়, ধর্ম-অধর্মের শিক্ষা প্রদানকারী ঐতিহাসিক গ্রন্থ। শুধুমাত্র মহাকাব্য রুপে নয় বরং  ধর্ম, অর্থ, কাম এবং মোক্ষসহ চতুর্বিধ পুরুষার্থের উল্লেখ রামায়ণের আলোচ্য। বৃদ্ধ রাজা দশরথ যেমন অসহায়ত্বের প্রতীক হয়ে উঠে, মাতা সীতা যেমন একনিষ্ঠ স্বামীর সঙ্গী হয়ে উঠে, তেমনি জীবন মার্গের শ্রেষ্ঠ উপলব্ধির ধারক হয়ে উঠে ভগবান শ্রীরাম। মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরামের মানবসভ্যতার জন্য প্রদত্ত নৈতিক শিক্ষা আজও প্রাসঙ্গিক। সে শিক্ষা সমূহের মধ্যে, মৃত্যু ও সমাপ্তির অনন্য এক শিক্ষা রয়েছে। "মৃত্যুতেই শত্রুতার সমাপ্তি" - এ যেন জীবনের অনিবার্য সত্য। এই সত্যকে মেনে নিয়ে কারো প্রতি বিদ্বেষ, ঘৃণা নিজের হৃদয়ে লালন করা থেকে বিরত থাকার মানবিক শিক্ষা প্রদান করেছেন মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরাম। 

বাল্মিকী রামায়ণে অধর্ম, অন্যায়ের প্রতীক রাবণ। নিজ জীবনে অনন্য ধর্মাচরণ করলেও নিজের কর্মকাণ্ড ছিল অধর্মের সঙ্গী। কিন্তু রাবণকে হত্যার করার পরেও ভগবান শ্রীরাম কোনো ঘৃণাসূচক আচরণ করেননি। কারণ, জীবনের শ্রেষ্ঠ উপলব্ধি তার মধ্যে বিদ্যমান ছিল। সেজন্য, অপরাধী হওয়া সত্ত্বেও নিহত হওয়ার পর মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরাম  বিভীষণকে  সম্মান এবং শ্রদ্ধার সাথে রাবণের পারলৌকিক কৃত্যাদি সম্পন্ন করতে নির্দেশ প্রদান করেন। নিজকৃত অধর্মের জন্য নিঃসঙ্গ হয়েছেন, নিজ কুলনাশ করেছে। কিন্তু মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে এই নশ্বরদেহ কাহারো বিদ্বেষ কিংবা ঘৃণার পাত্র হয়নি। সেজন্য, বিভীষণ রাবণের সে মহৎকর্ম সমূহকে স্মরণ করে শেষকৃত্য করতে ইচ্ছে প্রকাশ করেন। কারণ, সে অন্যায়কারী জীবিত অবস্থায় ছিল। 

"এষোঽহিতাগ্নিশ্চ মহাতপাশ্চ
বেদান্তগঃ কর্মসু চাগ্র্য়শূরঃ। 
এতস্য য প্রেতগতস্য কৃত্যং
তৎ কর্তুমিচ্ছামি তব প্রসাদাৎ ৷৷"
- বাল্মিকী রামায়ণ, যুদ্ধকাণ্ড,১০৯.২৩

অর্থাৎ, রাক্ষসরাজ রাবণ অগ্নিহোত্রী, মহাতপস্বী,
বেদান্তবেত্তা এবং যাগযজ্ঞাদি কর্মসমূহে অত্যন্ত পারঙ্গম। এখন আমি আপনার আশীর্বাদ নিয়ে তার লোকান্তরিত প্রেত-কৃত্যাদি সমাধা করতে চাই।

বিভীষণ এর এই অভিমত এর সঙ্গে মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরাম একমত পোষণ করেন। শত্রুতার সমাপ্তি মৃত্যুতে, সেজন্য শত্রুর মৃতদেহ সসম্মানে শেষকৃত্য করা ধর্মকার্য। নিজ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার জন্য তিনি যে অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন তা আমাদের জন্য অনুকরণীয় , মানুষ বেঁচে থাকলে বিভিন্ন কারণে একে অন্যের প্রতি যে বৈরিতার উৎপত্তি হয়, মৃত্যুতেই সেই সকল বৈরিতার পরিসমাপ্তি হয়। যুদ্ধ যদি আদর্শিক ধর্ম এবং অধর্মের হয় এবং অধর্মকে আশ্রয় করে কেউ শত্রুপক্ষ হয়ে যায়, তবে সেই অধার্মিক শত্রুর বিনাশের সাথেসাথেই সকল শত্রুতার শেষ হয়ে যায়। শ্রীরামচন্দ্র আরও বলেন, সীতাকে হরণ করায় রাবণকে বধ করা প্রয়োজন ছিলো।

স তস্য বাক্যৈঃ করুণৈর্মহাত্মা
সম্বোধিতঃ সাধু বিভীষণেন।
আজ্ঞাপয়ামাস নরেন্দ্রসূনুঃ ৷
স্বর্গীয়মাধানমদীনসত্ত্বঃ।।
মরণান্তানি বৈরাণি নিবৃত্তং নঃ প্রয়োজনম্। 
ক্রিয়তামস্য সংস্কারো মমাপ্যেষ যথা তব৷৷ 
(রামায়ণ:যুদ্ধকাণ্ড,১০৯.২৪-২৫)

"এইরূপে বিভীষণের করুণাজনক বচনসমূহে রাবণের মাহাত্ম্যাদি ভালোভাবে বুঝতে পেরে উদারচেতা রাজকুমার মহানুভব শ্রীরাম রাবণের উত্তম লোকে গতির জন্য বিভীষণকে অন্ত্যেষ্টি-কর্মাদি সম্পাদন করার অনুমতি প্রদান করলেন।

তিনি আরো বলেন, হে বিভীষণ! জীবদ্দশাতেই বৈরিতা জন্মায়। শত্রুপক্ষের বিনাশের পর শত্রুতার শেষ হয়ে যায়। আমাদের রাবণবধরূপ প্রয়োজন সফল হয়েছে। অতএব তুমি রাবণের অন্তেষ্টিক্রিয়া সংস্কার সম্পন্ন করো। এখন এ যেমন তোমার প্রিয়পাত্র, তেমনি আমারও।

মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরামকে কেন জগৎ শ্রেষ্ঠ বলা হয় তা এই সূক্ষ্ম অথচ তাৎপর্য ঘটনায় সুস্পষ্ট। এই মহান হৃদয়ে শত্রুর জন্যেও প্রেম, দয়া, ভালোবাসা ছিল। সেখানে আমরা বর্তমানে মৃত্যু পরবর্তী সময়েও মানুষকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করি। কিন্তু এটা অন্যায়। সত্য সনাতন এর আদর্শ ইহা নয়।প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ঘৃণা পোষণ করে, মনুষ্য সমাজকে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করা অধর্ম ও সনাতন শিক্ষার বিপরীত। ঘৃণাকে কখনো প্রতিহিংসার মাধ্যমে শেষ করা যায় নাহ, কারণ ঘৃণার মাধ্যমে ঘৃণার বৃদ্ধি ঘটে। যেরূপ আগুনে ঘি ঢাললে তা নিঃশেষ না হয়ে বৃদ্ধি পায়। আগুনকে নেভাতে হলে ঠিক যেমন ঘি নয় জলের প্রয়োজন, তেমনি ঘৃণার জন্যে যেমন ভালোবাসা প্রয়োজন। তবে জগৎ হয়ে উঠবে সুন্দর ও প্রেমময়। 

সেজন্য হে অমৃতের সন্তানগণ! সত্য সনাতন এর আদর্শে উজ্জীবীত হয়ে জীবন ও জগৎকে সুন্দর করে তুলি।

Run with #veda

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ