"বৈশাখ-ই আকবর" - পহেলা বৈশাখ নিয়ে নিত্য নতুন হিপোক্রেসি!


"বৈশাখ-ই আকবর" - পহেলা বৈশাখ নিয়ে নিত্য নতুন হিপোক্রেসি 

​"এসো হে বৈশাখ এসো এসো
তাপসনিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,
বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক যাক যাক
এসো হে বৈশাখ এসো এসো।"

রবীন্দ্রমানসের রুদ্র-তপস্যার এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ 'এসো হে বৈশাখ'। কবিগুরু এই গানে বৈশাখকে কেবল একটি মাস হিসেবে নয়, বরং জরাজীর্ণতা ও ক্লানি মুছে ফেলার এক পবিত্র অগ্নিশুদ্ধি হিসেবে আবাহন করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা কিংবা গানের ছন্দে ভেসে উঠে এই গ্রামবাংলার মাটি মানুষের জীবনগাথাঁ ও হাজার বছরের ঐতিহ্য ও সমৃদ্ধ ইতিহাস। নদীবিধৌত এই বাংলার জনজীবনে কৃষি তথা ফসল অতীব গুরুত্বপূর্ণ। ফলশ্রুতিতে, হাজার বছরের ইতিহাসে ফসল, কৃষিকে ঘিরে বাংলার সংস্কৃতি, সংগ্রাম রচিত হয়েছে এবং বাংলা নববর্ষ উহার ব্যতিক্রম কিছু নয়। এই গ্রামবাংলার চিরাচরিত জীবনধারায় নববর্ষ এক প্রাণোচ্ছল পালক স্বরুপ হয়ে আবির্ভূত হয়েছে। 

বাঙালি জাতি ভৌগোলিক ভাবে মিশ্রজাতি সত্তা বহন করে। কোনো এক জনগোষ্ঠী থেকে বাঙালি জাতির আগমন ঘটেনি বরং এই জাতি সত্তার ডিএনএ-তে বিবিধ জনজাতির মিশ্রণ অনস্বীকার্য সত্য। সেজন্য, বাংলার জনজীবনে পর্তুগিজ থেকে মোঙ্গল কিংবা দ্রাবিড় থেকে পিকিং বহু জাতির মিশ্রণ ঘটেছে। তবে এই মিশ্রণ শুধুমাত্র একক পরিসীমায় সীমাবদ্ধ নয় বরং বিবিধ কৃষ্টি-সংস্কৃতিও বাংলার জীবন যোগ হয়েছে। কখনো শাসকের হাত ধরে, কখনো বণিকদের হাত ধরে নতুন নতুন পালক যুক্ত হয়ে এসেছে হাজার বছরের ইতিহাসে।  

তবে বাঙালি জাতি সর্বদাই নিজের পূর্ববর্তী রীতিনীতি, ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে। নতুন কিছু যুক্ত করলেও পুরোনো কিছু অস্বীকার করেনি। কিন্তু সময়ের আবর্তে সকল সংস্কৃতি সহাবস্থানকে স্বাগত না জানিয়ে আধিপত্য সৃষ্টি করে হাজার বছরের সেই ঐতিহ্য, কৃষ্টি-সংস্কৃতিকে অস্বীকার, বাতিল কিংবা নিষিদ্ধ করতে তৎপর। বাংলা নববর্ষ সেই দীর্ঘ সময় ধরে চলা আসা সংস্কৃতির দেদীপ্যমান দৃষ্টান্ত। কিন্তু দেশভাগের সময় থেকে বর্তমান পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী বাঙালিত্বকে অস্বীকার করা, হাজার বছরের সংস্কৃতিকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করে আসছে। বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ সেই সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর অন্যতম চক্ষুশূল হিসেবে পরিণত হয়েছে। 

​ঐতিহাসিকভাবেই বাংলা নববর্ষ তথা পহেলা বৈশাখ বাঙালির আত্মপরিচয় ও প্রতিরোধের প্রতীক। পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পর থেকেই শাসকগোষ্ঠী বাঙালির হাজার বছরের এই সংস্কৃতিকে 'হিন্দুয়ানি' বা 'ইসলাম বিরোধী' তকমা দিয়ে বাতিলের চেষ্টা চালিয়েছিল। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার পহেলা বৈশাখকে সরকারি ছুটি ঘোষণা করলেও, পাকিস্তানি জান্তা সরকার বারবার তা রদ করার চেষ্টা করেছে। এমনকি বাঙালির প্রাণের উৎসবকে স্তব্ধ করতে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। কিন্তু বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনা এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসনকে মেনে নেয়নি; বরং ছায়ানটের বর্ষবরণ আর রাজপথের আলপনা হয়ে উঠেছিল স্বাধিকার আন্দোলনের অঘোষিত ইশতেহার।

​দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে এসেও সেই একই সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও হিপোক্রেসির ছায়া আজও বর্তমান। যে অপশক্তি একাত্তরে এই জনপদকে মেধাশূন্য করতে চেয়েছিল, আজ তাদের উত্তরসূরিরা ভিন্ন আবরণে পহেলা বৈশাখকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। কখনো ধর্মের দোহাই দিয়ে, কখনো 'বিদেশি সংস্কৃতি'র মিথ্যে অজুহাতে তারা মঙ্গল শোভাযাত্রা কিংবা বাঙালির সার্বজনীন উৎসবের টুটি চেপে ধরতে চায়।

​আশ্চর্যের বিষয় হলো, যারা বিশ্বায়নের এই যুগে বিজাতীয় সংস্কৃতির জোয়ারে গা ভাসাতে দ্বিধা করে না, তারাই যখন বাঙালির নিজস্ব শিকড়ের উৎসব নিয়ে 'হিপোক্রেসি' বা ভণ্ডামির আশ্রয় নেয়, তখন বোঝা যায় তাদের লড়াইটা আপাদমস্তক বাঙালির স্বতন্ত্র জাতিসত্তার বিরুদ্ধে। আধুনিকতার নামে স্বকীয়তা বিসর্জন দেওয়া আর রক্ষণশীলতার নামে ঐতিহ্যকে অস্বীকার করা। এই দুই প্রান্তিকতার যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে আমাদের পহেলা বৈশাখ। অথচ বৈশাখ মানেই ছিল সব সংকীর্ণতার উর্ধ্বে উঠে মহামিলনের গান।

ইতিহাসের এক অদ্ভুত পরিহাস হলো, যারা আজ বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যকে 'শুদ্ধ' করার নামে কাটাছেঁড়া করতে চায়, তাদের পূর্বসূরিরা একসময় বাংলা ভাষাকেই গিলে খেতে চেয়েছিল। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যখন দেখল বাঙালির আবেগ তার ভাষায়, তখন তারা ফন্দি এঁটেছিল বাংলা বর্ণমালা বদলে আরবি হরফ প্রবর্তনের। তাদের ধারণা ছিল, জবর-জের দিয়ে লিখলেই বুঝি এই মাটি ও মানুষের ভাষা 'তথাকথিত ধর্মীয়' হয়ে উঠবে। 

​​"আজকের হিপোক্রেসির সবচেয়ে বড় নিদর্শন হলো পহেলা বৈশাখকে 'বৈশাখ-ই আকবর' বলে মোঘলীয় মোড়কে ঢাকার চেষ্টা। এটি এক ধরনের চরম দ্বিচারিতা। একদিকে তারা বাঙালিত্বকে 'হিন্দুয়ানি' বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছে, আবার নিজেদের মতাদর্শের সাথে খাপ খাওয়াতে সেই বৈশাখকেই আকবরের দোহাই দিয়ে উর্দুকরণ বা ফার্সিকরণের মাধ্যমে 'সহী' করার ব্যর্থ চেষ্টা চালায়।

​অথচ যে আকবরের দোহাই দিয়ে তারা বৈশাখকে সম্বোধন করতে চায়, সেই আকবরের 'দীন-ই-ইলাহি' বা তার প্রবর্তিত জীবনদর্শন নিয়ে খোদ রক্ষণশীল মহলেই কত বিতর্ক! যে সম্রাটকে তারা নিজ বিশ্বাসের মানদণ্ডে সবসময় প্রশ্নবিদ্ধ করে এসেছে, আজ কেবল বৈশাখকে বাঙালির শিকড় থেকে বিচ্যুত করতে সেই সম্রাটেরই তকমা ব্যবহার করা কি চরম হিপোক্রেসি নয়? তারা ভুলে যায়, এই জনপদের ধুলিকণা, নদনদী আর মাটির পরতে পরতে মিশে আছে সনাতন সংস্কৃতির দীর্ঘ ইতিহাস। মানুষ পথ পরিবর্তন করতে পারে, কিন্তু নিজের শেকড় বা ডিএনএ পরিবর্তন করতে পারে না।

আরও ​বিস্ময়কর হলো, যারা আজ 'মঙ্গল' শব্দে আপত্তি তোলে কিংবা মঙ্গল শোভাযাত্রার মাঝে বিভাজন খুঁজে পায়, তারা কি জানে না বঙ্গাব্দের প্রতিটি মাসের নাম "বৈশাখ থেকে চৈত্র" আদতে প্রাচীন জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং নক্ষত্রপুঞ্জের নাম থেকে আসা? শনি থেকে শুক্র, সপ্তাহের প্রতিটি বারের নামের পেছনে যে সংস্কৃতি রয়েছে, তা তো এই বাংলারই আদি উত্তরাধিকার। এই বৈশাখী মেলা, হালখাতা কিংবা আলপনা এগুলো কোনো আমদানিকৃত মোঙ্গল বা পারস্য কিংবা দ্রাবিড় সংস্কৃতিও নয়, বরং এই পলিমাটির জনজাতির ঐতিহ্যের বিবর্তিত রূপ।

​বাঙালির এই শেকড়কে অস্বীকার করা মানে নিজের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করা। নদী যেমন তার উৎসকে অস্বীকার করলে শুকিয়ে যায়, বাঙালিও যদি তার আদি কৃষ্টিকে 'হিন্দুয়ানি' বলে দাগিয়ে দিয়ে বর্জন করে, তবে তার আত্মপরিচয় বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। যারা আজ ইতিহাসকে নতুন করে শেখাতে চাইছে, তারা মূলত বাঙালির হাজার বছরের সংকর ও সহনশীল ঐতিহ্যকে একরৈখিক এবং সংকীর্ণ গণ্ডিতে বন্দি করতে চায় যা এই মাটির প্রকৃতির সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। 

পরিশেষে, পহেলা বৈশাখ কেবল একটি পঞ্জিকার তারিখ নয়, বরং বাঙালির হাজার বছরের অস্তিত্ব রক্ষার এক অবিনাশী স্মারক। আজ যারা বৈশাখকে ‘মোগলীয়’ প্রলেপ দিয়ে ঢাকার চেষ্টা করছে কিংবা আদি কৃষ্টিকে ‘হিন্দুয়ানি’ সম্বোধন দিয়ে সমাজচ্যুত করতে চাইছে, তারা মূলত বাঙালির আত্মপরিচয়কেই অস্বীকার করছে।

​​ইতিহাস সাক্ষী, এই বাংলার নদনদী আর ভাষার পরতে পরতে মিশে থাকা আদি উত্তরাধিকার কোনো আমদানিকৃত বস্তু নয়, এটি এই মাটি মানুষের নিজস্ব সম্পদ। সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী না চাহিলেও বৈশাখ আসবে, তার চিরচেনা হাওয়া দিবে। তারা মুখ ফিরিয়ে নিলেও বাঙালির রক্তে মিশে থাকা সেই ঐতিহ্য আপন মহিমায় স্বগৌরবে উচ্চারিত হবে। নদী যেমন তার উৎসকে অস্বীকার করলে শুকিয়ে যায়, বাঙালিও তার শেকড় ছিঁড়ে বাঁচতে পারে না। তাই সব হিপোক্রেসির অবসান হোক। বৈশাখ তার আপন মহিমায় টিকে থাকুক বাঙালির হৃদয়ে, কারণ শেকড়হীন কোনো জাতি কখনো মহীরুহ হতে পারে না। কবিগুরুর ভাষায়

 "মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা, 
অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।"

#veda

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ