"পর্নোগ্রাফিকে না বলুন"
মনুষ্য জীবন এই জন্ম-মৃত্যুর আবর্তনের মধ্যে সবচেয়ে কাঙ্খিত। কারণ, এই জগতে উপস্থিত প্রতিটি জীব শুধুমাত্র ভোগ করে কিন্তু সে মুক্তির লক্ষ্যে কর্ম করতে অপারগ। একমাত্র মনুষ্যদেহই জন্ম মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তির জন্য জীবাত্মা কর্ম করতে পারে। কারণ, মনুষ্য ও অপর প্রাণীর মধ্যে রয়েছে নির্দিষ্ট তবে গুরুত্বপূর্ণ এক পার্থক্য। সে পার্থক্যকে নির্দেশ করে কৌটিল্য বলেছেন,
"আহারনিদ্রা ভয় মৈথুনানি সমানি চৈতানি নৃণাং পশূনাম্। জ্ঞানং নরাণামধিকো বিশেষো জ্ঞানেন হীনাঃ পশুভিঃ সমানাঃ।।" - চাণক্য নীতি ১৭/১৬
অর্থাৎ, আহার, নিদ্রা, ভয় ও মৈথুন এগুলো মানুষ এবং পশুসমূহের মধ্যে সমানরুপে পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু মানুষের মধ্যে কেবল জ্ঞান অধিক বিশেষ, কারণ জ্ঞান কেবল মনুষ্যের মধ্যে পাওয়া যায়।
জ্ঞান মনুষ্যকে উচিত-অনুচিত, কর্ম-অকর্ম, হিতাহিতজ্ঞান উপলব্ধি করতে সহায়তা করে। কিন্তু আমরা সত্যি কি এই মনুষ্য দেহের উত্তম ব্যবহার করছি ⁉️ বর্তমান সময়ের আবর্তে, মনুষ্য বহুবিধ অভ্যাস গড়ে তুলেছে। তবে এই আধুনিকতা সর্বথা উত্তম বস্তু নিয়ে আসে নাহ, নদীর জল যেমন জলের সঙ্গে কিছু পলি নিয়ে আসে, তেমনি আধুনিক নগরসভ্যতা প্রযুক্তির সহজলভ্যতার সাথে কিছু বিকৃত বিষয়াদি নিয়ে আসে। যা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে ভঙ্গুর করে তোলে, যেমন লৌহের মধ্যে লবণাক্ত কণা ভঙ্গুর করে তোলে।
বিবিধ বিকৃত বিষয়াদির মধ্যে পর্নোগ্রাফি অন্যতম ও সমাজের সুপ্ত ঘাতক। মনুষ্য মৈথুনের মাধ্যমে এই জগতে জন্মলাভ করে। বৈদিক শাস্ত্রে সন্তান জন্মদানের উদ্দেশ্য মৈথুনের উল্লেখ পাওয়া যায়। অর্থাৎ, যৌনতা আমাদের জীবনেরই অঙ্গ। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে, যৌনতা পরিণত হয়েছে বিকৃত এক ধারণায়। এরূপ ধারণা থেকে পর্নোগ্রাফির উৎপত্তি। সিমিলারওয়েবের বিশ্লেষণে দেখা গেছে,
বিশ্বে প্রতিদিন গড়ে তিন ঘণ্টা ১৬ মিনিট করে পর্নো সাইট দেখা হয়। এছাড়াও চীনের নানজিং ইউনিভার্সিটির স্কুল অব দ্য এনভায়রনমেন্টের পিএইচডি শিক্ষার্থী মো. আবু বকর সিদ্দিকের তত্ত্বাবধানে বিখ্যাত উইলি পাবলিশারের ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল হেলথ সায়েন্স রিপোর্টের আগস্ট সংখ্যায় এ গবেষণা অনুসারে, বাংলাদেশের প্রায় ৬২.৯ শতাংশ কিশোর-কিশোরী পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত।
এরূপ পরিসংখ্যান আমাদের বিস্মিত করার পাশাপাশি আতঙ্কিত করে তোলে। কারণ, পর্নোগ্রাফিতে প্রদর্শিত বিষয়াদি কখনো বাস্তবসম্মত হয় নাহ। বরং বিকৃত এক ধারণায় আবদ্ধ করে রাখা হয় এমন দর্শককে। ফরাসি পর্যবেক্ষক সংস্থা হাই কাউন্সিল ফর ইকুয়ালিটি বিটউইন উইমেন অ্যান্ড মেনের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, শতকরা ৯০ শতাংশ অনলাইন পর্নোগ্রাফিতে মৌখিক ও শারীরিকভাবে নারীর প্রতি সহিংসতা রয়েছে। ফলস্বরূপ, পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত ব্যক্তি অস্বাভাবিক আচরণ করে থাকে। যার ফলে, ধর্ষণ-বলাৎকারসহ নারী ও শিশুর প্রতি বিবিধ বিকৃত ধারণা পোষণ করে।
কিন্তু এমন অশ্লীল বিষয় দেখা ধর্মসঙ্গত নয়। ফলশ্রুতিতে, বর্তমান সময়ের আধুনিক গবেষণায়ও পর্নোগ্রাফিক আসক্তি একপ্রকার মানসিক বিকারগ্রস্ততা হিসেবে চিহ্নিত করে থাকে। যজুর্বেদে বলা হয়েছে,
"ভদ্রং পশ্যেমাক্ষভির্যজত্রাঃ"▪️যজুর্বেদ ২৫.২১
অর্থাৎ, আমরা চোখ দিয়ে ভদ্র বস্তুু দর্শন করি।
ঈশ্বর আমাদের এই দৃষ্টিশক্তি প্রদান করেছেন উত্তম, ভদ্র বস্তু দেখার জন্য। কিন্তু আমরা সে চোখ ব্যবহার করছি অশ্লীলতার দর্শনে। যা আমাদের নৈতিক চরিত্রকে যেমন প্রশ্নবিদ্ধ করছে, তেমনি সামাজিক ব্যাধির প্রসার ঘটাচ্ছে।
▪️পর্নোগ্রাফি থেকে মুক্তির কৌশল:
সকল অস্থিতিশীলতা কারণ এই ইন্দ্রিয়। আমরা এই ইন্দ্রিয়কে যখন নিজের বশে নিয়ে আসতে পারবো তখন সকল কিছু আমাদের বশে থাকবে। সেজন্য শ্রীমদ্ভগবদগীতায় যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন,
"বন্ধুরাত্মাত্মনস্তস্য যেনাত্মৈবাত্মনা জিতঃ।
অনাত্মনস্তু শত্রুত্বে বর্তেতাত্মৈব শত্রুবৎ।।"
- গীতা ৬/৬
অর্থাৎ, যিনি তার মনকে জয় করেছেন, তার মন তার পরম বন্ধু, কিন্তু যিনি তা করতে অক্ষম, তার মনই তার পরম শত্রু।
কিন্তু মন সত্যি চঞ্চল ও দুর্দমনীয়। । সেজন্য এই অদম্য মন সম্পর্কে অর্জুন ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে বলছেন,
"চঞ্চলং হি মনঃ কৃষ্ণ প্রমাথি বলবদ্দৃঢ়ম্ ৷
তস্যাহং নিগ্রহং মন্যে বায়োরিব সুদুষ্করম্ ॥"
- শ্রীমদ্ভগবদগীতা ৬/৩৪
অর্থাৎ, হে কৃষ্ণ ! মন অত্যন্ত চঞ্চল, শরীর ও ইন্দ্রিয়সমূহের বিক্ষেপ উৎপাদক, দুর্দমনীয় এবং অত্যন্ত বলবান, একে নিরুদ্ধ করা বায়ুপ্রবাহকে রোধ করার মতই সুকঠিন৷
মনই সকল ইন্দ্রিয়ের নিয়ন্ত্রক। সেজন্য, সে চঞ্চল মনকে অধ্যাবসায়, একনিষ্ঠতা, শৃঙ্খলা ও অভ্যাসের দ্বারা ক্রমান্বয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এরুপ উপায়ে মনকে নিয়ন্ত্রণের কৌশলগুলো প্রদান করে বলেছেন,
"অসংশয়ং মহাবাহো মনো দুর্নিগ্রহং চলম্।
অভ্যাসেন তু কৌন্তেয় বৈরাগ্যেণ চ গৃহ্যতে ॥"
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা- ৬/৩৫
অর্থাৎ, হে মহাবাহো! মন যে দুর্দমনীয় ও চঞ্চল তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু হে কৌন্তেয়! ক্রমশ অভ্যাস ও বৈরাগ্যের দ্বারা মনকে বশীভূত করা যায়।
পর্নোগ্রাফিতে আসক্তি নিরসনের ৫টি অভ্যাস গড়ে তুলুন।
১. নিজ মন ও ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণে ধর্মকার্যে নিযুক্ত করুন। সেজন্য, নিয়মিত স্নান করে শাস্ত্রপাঠ, ধর্ম আলোচনা শুনুন।
২. নিজেকে ব্যস্ত রাখার প্রয়াস করুন এবং ব্যায়াম করুন।
৩. নিজ মোবাইল ফোনে ব্যবহারকৃত সার্চ ইঞ্জিনে সেসকল ডার্ক সাইড সমূহ ব্লক করুন।
৪. যখনই মন পর্নোগ্রাফি দিকে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করবে, আপনি দ্রুত উঠে হেঁটে আসুন কিংবা ফোনে ভজন শোনার চেষ্টা করুন।
৫. অবশ্যই রাত্রিকালীন ফোন ব্যবহার থেকে বিরত রাখুন নিজেকে।
হে অমৃতের সন্তানগণ! মনুষ্য দেহ দুর্লভ। উত্তম হওয়ার পরিবর্তে তাকে অধঃপতনে ঠেলে দেওয়া মুর্খামি। মনুষ্য দেহের মাহাত্ম্য বর্ণনা করে তান্ড্য ব্রাহ্মণে বলা হয়েছে,
"নরাঃ দেবানাং গ্রামঃ" - তান্ড্য ব্রাহ্মণ ৬/৯/২
অর্থাৎ, এই মানবদেহ হলো দেবগণের গ্রাম বা আবাস্থল।
ঐতরেয়োপনিষদ্ এ ঋষি বলেছেন,
"পুরুষো বাব সুকৃতম" - ঐতরেয়োপনিষদ্ ১/২/৩
অর্থাৎ, এই মানবদেহ ঈশ্বরের উত্তম নির্মাণ, তাই এটি সুকৃত।
▪️এই মনুষ্য শরীরের মহত্ত্ব বর্ণনা করে যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শ্রীমদ্ভগবদগীতায় এই মনুষ্য শরীরকে ক্ষেত বলে অভিহিত করেছেন।
শ্রীভগবান্ উবাচ-
"ইদং শরীরং কৌন্তেয় ক্ষেত্রমিত্যভিধীয়তে" - গীতা ১৩/২
অর্থাৎ, শ্রীভগবান বললেন- হে কৌন্তেয়(অর্জুন)! এই শরীর "ক্ষেত্র" এই নামে অভিহিত হয়।
তবে আমরা কেন এই উত্তম দেহে দেবতার আবাস সৃষ্টি না করে, অধঃপতনের দিকে নিয়ে যাবো ⁉️যেখানে বিনাশ ও হতাশা একমাত্র পরিণাম হবে। আমরা পর্নোগ্রাফিকে না বলি, ধর্মকার্যে হ্যাঁ বলি।