"মহারাজা লক্ষ্মণমাণিক্য ও ইতিহাসের অন্তরালে প্রাচীন হিন্দুরাজ্য ভুলুয়া"


"ভুলুয়া থেকে নোয়াখালী"

"মহারাজা লক্ষ্মণমাণিক্য ও ইতিহাসের অন্তরালে প্রাচীন হিন্দুরাজ্য ভুলুয়া [নোয়াখালী]" 

▪️প্রাচীন ​বাংলার দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তের লোনা জল আর মেঘনার মোহনা যেখানে বঙ্গোপসাগরের বিশালত্বের সাথে মিশেছে, সেই আর্দ্র পলিমাটিতেই এক সময় মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল এক কালজয়ী সাম্রাজ্য। নদী যেখানে গড়ে তুলেছিল সীমানা, পাহাড় হয়েছিলো দুর্গ, যে সাম্রাজ্য ত্রিপুরার সুউচ্চ পাহাড় থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত নিজ সীমারেখা এঁকেছিল তা আজ ইতিহাস বিস্মৃত। মোঘল সম্রাট আকবরের বিরুদ্ধে যে স্বাধীন নৃপতি গর্জে উঠেছিল তিনিও হারিয়ে গিয়েছেন কালের আবর্তে।  আজ সে অঞ্চলের অধিবাসীগণ নিজেদের সেই কালজয়ী ইতিহাস ও শাসকের গৌরবময় কৃতিত্ব থেকে বিস্মৃত হয়েছে। সে হিন্দু নৃপতি যিনি বারো ভূঁইয়াদের অন্যতম একজন ছিলেন, যার লড়াই ছিল মোঘল আগ্রাসন থেকে এই বঙ্গভূমিকে স্বাধীন রাখার জন্যে। সে দুঃসাহসী শাসকের নাম মহারাজা লক্ষ্মণমাণিক্য ও সে দুর্দমনীয় প্রাচীন রাজ্যের নাম ভুলুয়া রাজ্য। 

▪️মহারাজা লক্ষ্মণমাণিক্য এই সাম্রাজ্যের অধিপতি হিসেবে সুখ্যাতি অর্জন করলেও ভুলুয়া রাজ্যের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস সুপ্রাচীন। যখন বখতিয়ার খিলজির অশ্বখুরধ্বনিতে গৌড়-বঙ্গ প্রকম্পিত, ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে মিথিলা থেকে আগত বিশ্বম্ভর সুর সমতট এর এই লোনা চরাঞ্চলে রোপণ করেছিলেন এক স্বাধীন হিন্দু রাজবংশের বীজ।ইতিহাসের কালপঞ্জিতে ১২০৩ থেকে ১৭২৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই জনপদটি কেবল একটি প্রশাসনিক ইউনিট ছিল না, বরং এটি ছিল সংস্কৃতি, সমৃদ্ধি ও ঐতিহ্যের এক সুসংহত মিলনস্থল। ​ভৌগোলিক অবস্থানই ভুলুয়াকে দিয়েছিল এক কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্ব। উত্তরপূর্বে ত্রিপুরার পাহাড়শ্রেণি, পশ্চিমে মেঘনার উত্তাল জলরাশি আর দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের দুর্ভেদ্য সীমানা - এই প্রাকৃতিক বেষ্টনী ভুলুয়াকে সমকালীন বাংলার রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে এক প্রকার বিচ্ছিন্ন ও সুরক্ষিত রেখেছিল। ফলস্বরুপ, এই নিভৃত জনপদেই ভুলুয়াকে সমৃদ্ধি ও শক্তিমান হতে যথোপযুক্ত সুযোগ প্রদান করে। 

▪️​ভুলুয়া সাম্রাজ্যের আদি ইতিহাস: "বিশ্বম্ভর সুরের আগমন ও মিথিলা সংযোগ"

​ভুলুয়া রাজ্যের ইতিহাসের শিকড় প্রোথিত রয়েছে সুদূর মিথিলার প্রাচীন আভিজাত্যের গভীরে। ১২০৩ খ্রিস্টাব্দের দিকে, যখন উত্তর ও পশ্চিম বাংলায় তুর্কি আক্রমণের ডামাডোল বাজছিল, তখন মিথিলার সুর রাজবংশের এক রাজপুত্র 'বিশ্বম্ভর সুর' এক আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে পিতৃভূমি ত্যাগ করেন। জনশ্রুতি ও কুলজী শাস্ত্রের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি এক দৈব নির্দেশে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার এই অরণ্যসংকুল এবং নদীমাতৃক ভূখণ্ডে পা রেখেছিলেন। ধারণা করা হয়, চট্রগ্রামের সীতাকুণ্ডের উদ্দেশ্যে ছিল এই যাত্রা। 

​বিশ্বম্ভর সুরের এই অভিযান কেবল একজন রাজপুত্রের দেশত্যাগ ছিল না, বরং তা ছিল এক নতুন সভ্যতার পত্তন। মিথিলা থেকে তিনি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন একদল নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ, বৈদ্য এবং কারিগর। যাঁরা পরবর্তী কয়েক শতাব্দী ধরে এই অঞ্চলের সামাজিক ও ধর্মীয় কাঠামো নির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। 

তবে রাজ্যের নামকরণ ছিল চমকপ্রদ ও আকস্মিক ঘটনা থেকে উদ্ভূত। তিনি এই বিশাল যাত্রাবহর নিয়ে বর্তমান লক্ষ্মীপুর অঞ্চলের একটি নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে বিশ্বম্ভর সুর যখন বিশ্রামের জন্য থামেন, তখন তিনি লক্ষ্য করেন তাঁর পথপ্রদর্শক বা অনুচররা ভুল পথে অগ্রসর হয়েছে। হতাশায় তিনি উচ্চারণ করেছিলেন—"ভুল হুয়া" (ভুল হয়েছে)। সেই 'ভুল' শব্দটি থেকেই কালক্রমে এই জনপদের নাম হয় 'ভুলুয়া'। তবে এই নামকরণ এর ইতিহাস বিচিত্র হলেও, বিশ্বম্ভর সুর অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে এই দুর্গম অঞ্চলটিকে বেছে নিয়েছিলেন, কারণ এর চারদিকের প্রাকৃতিক বেষ্টনী তাঁকে বহিরাগত আক্রমণ থেকে সুরক্ষা প্রদান করত।

​তিনি সেখানে মা কালীর উপাসনা শুরু করেন এবং স্থানীয় আদিবাসীদের সংগঠিত করে একটি সুসংহত প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলেন। বিশ্বম্ভর সুরের এই পদক্ষেপে অখ্যাত এক উপকূলীয় অঞ্চল হয়ে উঠে এক সমৃদ্ধ সাম্রাজ্য।ভুলুয়া কেবল একটি নতুন রাজবংশই পেল না, বরং এটি হয়ে উঠল সনাতনী সংস্কৃতির এক দুর্ভেদ্য কেন্দ্র। মিথিলার ব্রাহ্মণ্য আভিজাত্য এবং বাংলার এই উর্বর মাটির দৃঢ়তা, এই দুইয়ের সংমিশ্রণে যে সুর রাজবংশের যাত্রা শুরু হয়েছিল, মহারাজা লক্ষ্মণমাণিক্য ছিলেন সেই বংশেরই এক উজ্জ্বল উত্তরসূরি। 

মহারাজা বিশ্বম্ভর সুরের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ভুলুয়া সাম্রাজ্য উজ্জ্বল উত্তরসূরিদের মাধ্যমে এগোতে থাকে। ভুলুয়া রাজ্যের সুর রাজবংশের ইতিহাস প্রায় পাঁচশত বছরের এক গৌরবময় অধ্যায়। মিথিলা থেকে আগত এই রাজবংশটি নয়জন প্রধান শাসকের মাধ্যমে তাদের সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রেখেছিল। সে সমৃদ্ধির যাত্রায় ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে নাম লেখান মহারাজা লক্ষ্মণমাণিক্য।

▪️মহারাজা বিশ্বম্ভর সুর থেকে অন্তিম শাসক পর্যন্ত: 

🔆 মহারাজা গণেশ সুর: মহারাজা বিশ্বম্ভর সুর দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ভুলুয়া রাজ্যের সুর রাজবংশের সফল উত্তরসূরী ছিলেন রাজা গণেশ সুর। তিনি মহারাজা বিশ্বম্ভর সুরের পরবর্তী উত্তরাধিকারী। পিতা বিশ্বম্ভর সুরের সমৃদ্ধ রাজ্যকে আরো শক্তিশালী ও বিস্তৃতি দান করেন তিনি।  রাজ্যের সীমানা বিস্তারে মনযোগী হন এবং পার্শ্ববর্তী ক্ষুদ্র সামন্তদের পরাজিত করে ভুলুয়াকে শক্তিশালী করেন।

🔆 মহারাজা দনুজমর্দন সুর: ভুলুয়া রাজ্য সমৃদ্ধি লাভের জন্যে রাজা দনুজমর্দন সুর এর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি সীমানা বৃদ্ধিতে মনোযোগী না থাকলেও রাজ্যের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত ও কৃষিকাজের উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। সুনির্দিষ্ট অবদান রেখেছেন। ফলস্বরূপ, তার শাসনাধীন সময়ে ভুলুয়া রাজনৈতিকভাবে বেশ প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। 

🔆 মহারাজা শ্রীরাম খাঁ: ​সুর রাজবংশের চতুর্থ শাসক শ্রীরাম খাঁ ছিলেন বিশ্বম্ভর সুরের প্রপৌত্র। শ্রীরাম খাঁ যখন সিংহাসনে বসেন, তখন দিল্লী ও গৌড়ে সুলতানি শাসন প্রবল। প্রতিবেশী মুসলিম সালতানাতের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষা এবং রাজনৈতিক স্বীকৃতির প্রয়োজনে তিনি 'খাঁ' বা 'খান' উপাধি গ্রহণ করেন। তবে তৎকালীন সময়ে খাঁ' বা 'খান উপাধি সার্বজনীন ছিল। রাজা শ্রীরাম খাঁ নিজের নামানুসারে বর্তমান লক্ষ্মীপুরে শ্রীরামপুর গ্রাম প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে তিনি তাঁর রাজপ্রাসাদ এবং প্রশাসনিক কেন্দ্র স্থাপন করেছিলেন। 

🔆 মহারাজা তারা খাঁ: পিতার খাঁ উপাধি রাজা তারা বা তরুণি খাঁ অব্যাহত রাখে। তিনি রাজ্য বিস্তার না ঘটালেও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ভূমিকা পালন করেন। 

🔆 মহারাজা কন্দর্প রায়: ভুলুয়া রাজবংশের ষষ্ঠ শাসক রাজা কন্দর্প রায় ছিলেন এক দূরদর্শী পথপ্রদর্শক। তাঁর পূর্বসূরিরা সুলতানি প্রভাবে যে 'খান' উপাধি গ্রহণ করেছিলেন, তিনি তা বর্জন করে পুনরায় 'রায়' উপাধিতে ফিরে আসেন। এই উপাধি পরিবর্তন ছিল মূলত ভুলুয়া রাজ্যের স্বতন্ত্র হিন্দু পরিচয় ও সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের একটি সাহসী রাজনৈতিক পদক্ষেপ। তাঁর সময়েই ভুলুয়ার রাজসভা পুনরায় শাস্ত্রীয় পণ্ডিত ও ব্রাহ্মণদের পৃষ্ঠপোষকতায় মুখরিত হয়ে ওঠে। কন্দর্প রায়ের এই আদর্শিক দৃঢ়তাই পরবর্তী প্রজন্মের মহারাজা লক্ষ্মণমাণিক্যের বীরত্ব ও পাণ্ডিত্যের বলিষ্ঠ ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিল।

🔆​ মহারাজা দুর্লভ নারায়ণ বলরাম মাণিক্য:  ভুলুয়ার রাজসিংহাসন যখন দুর্লভ নারায়ণ বলরাম মাণিক্যের অধীনে, তখন এই রাজ্যের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। তিনি শুধুমাত্র এক জনপদের শাসক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন সেই দূরদর্শী রাজা যিনি ত্রিপুরার শক্তিশালী মাণিক্য রাজবংশের সাথে সৌহার্দ্যরে সেতু নির্মাণ করেছিলেন। ত্রিপুরার রাজাদের কাছ থেকে পাওয়া সেই পবিত্র 'রাজটিকা' ভুলুয়ার রাজন্যবর্গকে এক অনন্য আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক বৈধতা দান করেছিল, যা তাঁদের মুঘল আগ্রাসনের মুখেও মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। 

🪷 মহারাজা লক্ষ্মণমাণিক্য: ​বাংলার ইতিহাসে যখন মুঘল সাম্রাজ্যবাদের কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছিল, তখন ভাটি বাংলার যে ক'জন স্বাধীনচেতা নৃপতি দিল্লিকে চ্যালেঞ্জ জানানোর সাহস করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে মহারাজা লক্ষ্মণমাণিক্য ছিলেন এক অনন্য ব্যতিক্রম। তিনি কেবল বারো ভূঁইয়াদের অন্যতম সেনানী ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একাধারে 'শাস্ত্র ও শস্ত্রের' বিরল সন্মিলন। যেখানে অন্যান্য ভূঁইয়ারা কেবল সামরিক শক্তিতে মুঘলদের রুখতে চেয়েছিলেন, সেখানে লক্ষ্মণমাণিক্য ভুলুয়াকে গড়ে তুলেছিলেন এক অভেদ্য সাংস্কৃতিক ও সামরিক দুর্গ হিসেবে। 

🔆 মহারাজা অনন্তমাণিক্য: ​মহারাজা লক্ষ্মণমাণিক্যের পর সিংহাসনে বসেন তাঁর পুত্র অনন্তমাণিক্য। পিতার যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে তিনিও মুঘলদের বশ্যতা অস্বীকার করেছিলেন।  ১৬১১-১৬১২ খ্রিস্টাব্দের দিকে মুঘল সুবাদার ইসলাম খাঁ যখন সমগ্র বাংলা পদানত করার অভিযানে নামেন, তখন অনন্তমাণিক্য বীরত্বের সাথে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তিনি ভুলুয়ার সুরক্ষার জন্য ডাকাতীয়া নদীর তীরে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যূহ তৈরি করেছিলেন। কিন্তু পিতা লক্ষ্মণমাণিক্যের অনুপস্থিতি সর্বদাই লক্ষণীয় ছিল। ফলশ্রুতিতে, মুঘলদের বিশাল বাহিনী এবং উন্নত গোলন্দাজ দলের সামনে তাঁর সেনাবাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এই পরাজয়ের পর তিনি আরাকান (মগ) রাজ্যে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন, যার ফলে ভুলুয়ার স্বাধীন অস্তিত্ব বিলীন হয়ে এটি একটি মুঘল করদ রাজ্যে পরিণত হয়। 

🔆 রাজা অনন্তমাণিক্য: মহারাজা অনন্তমাণিক্যের পতনের পর ভুলুয়ার রাজবংশ মুঘলদের অধীনে জমিদারি বা ক্ষুদ্র সামন্ত রাজ্যে রূপান্তরিত হয়। এই সময়ে রাজা অমরমাণিক্য রাজপদ লাভ করেন। তাঁর শাসনকাল ছিল মূলত হারানো সম্মান পুনরুদ্ধারের চেষ্টা এবং অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষার কাল। তিনি মুঘলদের প্রতি অনুগত থেকেও এলাকার শান্তি ও ধর্মীয় ঐতিহ্য বজায় রাখতে সচেষ্ট ছিলেন। এই সময়ের শাসকরা তাঁদের সামরিক ক্ষমতা হারিয়ে ফেললেও স্থানীয় সংস্কৃতি ও ব্রাহ্মণদের পৃষ্ঠপোষকতায় নিজেদের নিয়োজিত রেখেছিলেন।

🔆 ​রাজা বিজয়মাণিক্য: ​ভুলুয়ার সুর-মাণিক্য রাজবংশের সর্বশেষ উল্লেখযোগ্য শাসক ছিলেন রাজা বিজয়মাণিক্য। ১৭২৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি তাঁর ক্ষীয়মাণ ক্ষমতা টিকিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু মোঘলদের অন্দরমহলের প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের কারণপ সমগ্র বাংলা অস্থিতিশীল হয়ে উঠে এবং তাঁর সময়েই ভুলুয়া রাজ্য পুরোপুরি প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার মুখে পড়ে। মুঘল রাজস্ব নীতি এবং অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রের ফলে বিজয়মাণিক্য তাঁর জমিদারি হারান। শেষ পর্যন্ত ১৭২৮ সালে ভুলুয়া পরগনাটি মুঘলদের নায়েব-নাজিমদের সরাসরি শাসনাধীনে চলে যায়। বিজয়মাণিক্যের পতন ও মৃত্যুর মাধ্যমেই ১২০৩ সালে বিশ্বম্ভর সুরের হাত ধরে শুরু হওয়া ৫২৫ বছরের এক প্রাচীন রাজবংশের ইতিহাসের চূড়ান্ত পরিসমাপ্তি ঘটে।

▪️​রাজা অনন্তমাণিক্য থেকে বিজয়মাণিক্য, এই শাসনামল ছিল সুর রাজবংশের সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্তের করুণ বিলাপ। যে রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন বিশ্বম্ভর সুর, তা সময়ের আবর্তে কখনও 'খান' উপাধির রাজনৈতিক আপস, আবার কখনও 'মাণিক্য' উপাধির রাজকীয় আভিজাত্যে উজ্জ্বল হয়েছে। কিন্তু ১৭১৭ থেকে ১৭২৮ সালের মধ্যে মুঘল রাজস্ব ব্যবস্থার কঠোরতা এবং প্রশাসনিক রদবদলে বিজয়মাণিক্যের পতন এই ৫২৫ বছরের প্রাচীন রাজবংশের ইতিহাসের চাকা থামিয়ে দেয়। ভুলুয়া রাজ্য তার সার্বভৌমত্ব হারিয়ে রূপান্তরিত হয় সাধারণ জমিদারিতে। এই গৌরবময় ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক ছিল মহারাজা ও বারো ভূঁইয়ার বীর মহারাজা লক্ষ্মণমাণিক্য। 

​🪷 মহারাজা লক্ষ্মণমাণিক্য: "শাণিত তলোয়ার ও ধ্রুপদী কলমের মহাকাব্য"

মধ্যযুগের বাংলার আকাশে যখন মুঘল সাম্রাজ্যবাদের ধূমকেতু ধেয়ে আসছিল, তখন মেঘনার পলিবিধৌত এই অবাধ্য ভূখণ্ডে এক অদম্য নক্ষত্র হয়ে জ্বলে উঠেছিলেন সুরবংশের শ্রেষ্ঠ সূর্য - মহারাজা লক্ষ্মণমাণিক্য। সুরবংশের অষ্টম ও শ্রেষ্ঠ শাসক মহারাজা লক্ষ্মণমাণিক্য শুধুমাত্র ভুলুয়ার সিংহাসনের অধিকারী ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন ভাটি বাংলার সেই দুর্লভ বীর, যাঁর এক হাতে ছিল জন্মভূমি রক্ষার শাণিত কৃপাণ আর অন্য হাতে ছিল শাস্ত্রীয় সুষমা মাখা শ্বেত চন্দন। বাংলার বারো ভূঁইয়াদের সেই উত্তাল ইতিহাসে লক্ষ্মণমাণিক্য এক ভিন্নধর্মী রাজর্ষির নাম। যিনি তলোয়ারের ঝনঝনানির মাঝেও ভুলুয়াকে সংস্কৃত সাহিত্যের এক শান্ত তপোবনে পরিণত করেছিলেন। 

​যাকে সম্রাট আকবরের দুর্ধর্ষ সেনাপতিরা সমিহ করতেন, যাঁর রণহুঙ্কারে মেঘনার লোনা জল প্রকম্পিত হতো, সেই প্রবল প্রতাপশালী হিন্দু নৃপতিই আবার নিভৃতে রচনা করতেন 'বিখ্যাত বিজয়'-এর মতো ধ্রুপদী নাটক। শৌর্য আর পাণ্ডিত্যের এমন বিরল মিতালী বাংলার ইতিহাসে খুব কমই দেখা যায়। আজ যখন ইতিহাসের ধুলোবালি প্রাচীন ভুলুয়ার সেই রাজপ্রাসাদ গ্রাস করে নিয়েছে, তখন লক্ষ্মণমাণিক্যের বীরত্ব আর তাঁর বিয়োগান্তক পরিণতি কেবল একটি রাজ্যের পতন নয়, বরং তা এক স্বাধীনচেতা হিন্দু শৌর্যের অমর আখ্যান হয়ে ইতিহাসের অন্তরালে দাঁড়িয়ে আছে।

▪️পাণ্ডিত্য ও রাজসভা: "যেখানে তলোয়ার হার মেনেছিল কলমের কাছে"

মহারাজা লক্ষ্মণমাণিক্যের রাজসভা ছিল তৎকালীন বাংলার 'দ্বিতীয় কাশী'। কারণ, তৎকালীন ভারতবর্ষে যখন ফার্সি ভাষার প্রভাব বাড়ছে, তখন তিনি ভুলুয়াকে সংস্কৃত ভাষা ও হিন্দু দর্শনের পুনর্জাগরণের কেন্দ্রে পরিণত করেছিলেন। মহারাজা লক্ষ্মণমাণিক্য কেবল একজন শাসক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন উচ্চস্তরের সংস্কৃত ব্যাকরণবিদ ও নাট্যকার। তিনি ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান সনাতনী শাসক। তাঁর রাজসভায় কেবল রাজকার্য নয়, বরং নিয়মিত শাস্ত্রীয় বিতর্ক এবং কাব্যচর্চা হতো। তাঁর পাণ্ডিত্যের খ্যাতি এতটাই ছড়িয়ে পড়েছিল যে, সমসাময়িক অনেক বড় বড় রাজারাও তাঁকে বুদ্ধিবৃত্তিক পরামর্শের জন্য সমীহ করতেন। তিনি নিজেও যুদ্ধক্ষেত্রেই পারদর্শী ছিলেন না, সাহিত্যের আঙিনায় তিনি অমর হয়ে আছেন তাঁর রচিত 'বিখ্যাত বিজয়' নামক সংস্কৃত নাটকের জন্য। মহারাজা লক্ষ্মণমাণিক্যের রাজসভা সবসময় মুখরিত থাকত মিথিলা, নবদ্বীপ এবং বারানসি থেকে আসা প্রথিতযশা পণ্ডিতদের পদচারণায়। তিনি গুণীজনের সমাদর করতে জানতেন; কথিত আছে, কোনো উচ্চশিক্ষিত পণ্ডিত তাঁর সভায় এলে তিনি সিংহাসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে সম্মান জানাতেন। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় ভুলুয়ায় বহু টোল ও চতুষ্পাঠী গড়ে উঠেছিল, যা এই অঞ্চলকে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষা কেন্দ্রে রূপান্তর করেছিল।

▪️রণকৌশল ও বীরত্ব: "মেঘনা তীরের অপরাজেয় সিংহ" 

​মহারাজা লক্ষ্মণমাণিক্য ছিলেন রণকৌশলে অত্যন্ত নিপুণ এবং অকুতোভয় এক যোদ্ধা। মুঘল সাম্রাজ্যের বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে তাঁর টিকে থাকার মূল শক্তি ছিল ভুলুয়ার দুর্ভেদ্য ভৌগোলিক অবস্থান এবং তাঁর সুসংগঠিত নৌ-বাহিনী। মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর গোলকধাঁধায় তিনি এমন এক জলজ প্রতিরক্ষা ব্যূহ তৈরি করেছিলেন, যা তৎকালীন মুঘল নৌ-সেনাপতিদের কাছে ছিল এক মূর্তিমান আতঙ্ক। ​বারো ভূঁইয়াদের জোটবদ্ধ শক্তিতে তাঁর ভূমিকা ছিল অন্যতম প্রধান স্তম্ভের মতো। তিনি কেবল নিজের রাজ্য রক্ষাই করেননি, বরং দুর্ধর্ষ মগ (আরাকানি) জলদস্যু এবং পর্তুগিজ হার্মাদদের উপদ্রব থেকে ভুলুয়ার উপকূলীয় জনপদকে মুক্ত রেখেছিলেন। তাঁর সামরিক প্রতাপ এতটাই ছিল যে, তাঁর জীবদ্দশায় কোনো বহিরাগত শক্তি ভুলুয়ার মূল ভূখণ্ডে স্থায়ী আধিপত্য বিস্তার করতে পারেনি। তাঁর বীরত্ব কেবল পেশীশক্তিতে নয়, বরং তাঁর প্রবল আত্মমর্যাদাবোধের মধ্যে প্রকাশিত হয়েছিল। যিনি দিল্লির বশ্যতা স্বীকার করার চেয়ে আমৃত্যু লড়াই করাকেই শ্রেয় মনে করেছিলেন।

​▪️ ট্র্যাজিক মহাপ্রয়াণ: "শঠতার কাছে বীরের আত্মসমর্পণ" 

মহারাজা ​লক্ষ্মণমাণিক্যের বীরত্বগাথার শেষ অঙ্কটি ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক। রণক্ষেত্রে যাঁকে পরাজিত করা ছিল দুঃসাধ্য, তাঁকে পরাস্ত করা হয়েছিল বিশ্বাসঘাতকতার জালে। বারো ভূঁইয়ার অন্যতম স্তম্ভ প্রতিবেশী যশোরের মহারাজা প্রতাপাদিত্যের সাথে তাঁর রাজনৈতিক মনস্তাত্ত্বিক লড়াই ছিল দীর্ঘদিনের। কথিত আছে, প্রতাপাদিত্য তাঁকে এক সন্ধি-বৈঠক ও ভোজসভার অছিলায় নিমন্ত্রণ করে অত্যন্ত সুকৌশলে বন্দী করেন।
​শৃঙ্খলিত অবস্থায়ও লক্ষ্মণমাণিক্যের রাজকীয় তেজ ম্লান হয়নি। বন্দী থাকাকালীন প্রতাপাদিত্য যখন তাঁকে মাথা নত করতে বলেন, তখন এই দার্শনিক রাজা সহাস্যে তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। দীর্ঘকাল বন্দিদশার অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করে এই মহান বীর ও পণ্ডিতের জীবনাবসান ঘটে। তাঁর মৃত্যু কেবল একটি রাজবংশের পতন ছিল না, বরং তা ছিল স্বাধীন বাংলার এক মেধা ও শৌর্যের নক্ষত্রপতন। তাঁর ত্যাগের মধ্য দিয়েই ভুলুয়ার আকাশে স্বাধীনতার শেষ সূর্যটি অস্তমিত হয়। 

▪️ইতিহাসের ধূসর স্মৃতি ও অমর উত্তরাধিকার: 

​মহারাজা লক্ষ্মণমাণিক্যের মহাপ্রয়াণের সাথে সাথে ভুলুয়ার মেঘনা তীরের সেই অপরাজেয় শৌর্যের প্রদীপটি স্তিমিত হয়ে এলেও, তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ আজও বাংলার ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল হয়ে আছে। তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন যে, প্রকৃত স্বাধীনতা কেবল ভূখণ্ড রক্ষার লড়াই নয়, বরং তা হলো নিজের সংস্কৃতি, ভাষা এবং আত্মপরিচয়কে বিসর্জন না দেওয়ার এক নিরন্তর সংগ্রাম। ​আজকের আধুনিক বাংলাদেশে ভুলুয়া রাজপ্রাসাদের সেই প্রাচীন ইঁট-পাথর হয়তো সময়ের ধুলোয় মিশে গেছে, কিন্তু লক্ষ্মণমাণিক্যের 'বিখ্যাত বিজয়' নাটকের শ্লোকগুলো কিংবা তাঁর অকুতোভয় সংগ্রামের কাহিনী আজও আমাদের ঐতিহ্যের শেকড়কে স্মরণ করিয়ে দেয়। তিনি ছিলেন একাধারে বাংলার রক্ষাকর্তা এবং বিদ্যার বরপুত্র। ইতিহাস হয়তো অনেক রাজার নাম মনে রাখে না, কিন্তু ভুলুয়া ও বাংলার ইতিহাসে লক্ষ্মণমাণিক্য চিরকাল বেঁচে থাকবেন শৌর্য আর পাণ্ডিত্যের এক অনন্য প্রতীক হিসেবে। ​শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও মেঘনার লোনা বাতাস যেন আজও সেই বীর রাজর্ষির দীর্ঘশ্বাসের সাথে এক অমর বীরগাথা শুনিয়ে যায়।

- Run With Veda  🪷

#veda #BanglaHistory #hindudynasty

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ