হারিয়ে যাচ্ছে নামের ‘শ্রী’ ও ‘শ্রীমতী’,
আমরা কি শেকড়বিমুখ হচ্ছি ⁉️
‘নাম’ আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। প্রতিদিনের প্রতিটি মুহূর্তে একে অপরের সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে নামই আমাদের প্রধান অবলম্বন। তবে নাম শুধুমাত্র কিছু শব্দের সমষ্টি নয়; এটি একজন ব্যক্তির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক। উদাহরণস্বরূপ, একই অর্থের নাম বাংলা ও তামিল ভাষায় ভিন্নভাবে উচ্চারিত হয়, যার সাথে মিশে থাকে স্থান, পিতৃপরিচয় ও অর্জিত মর্যাদা।
সনাতন সংস্কৃতিতে নামের পূর্বে সম্মানসূচক শব্দ ব্যবহারের ঐতিহ্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ। মজার বিষয় হলো, আমাদের প্রাচীন মহাপুরুষ ও আদর্শিক ব্যক্তিত্বদের নামের সাথে কোনো নির্দিষ্ট পদবির ব্যবহার পাওয়া যায় না। কারণ, পদবির প্রচলন কয়েক শতাব্দীর ইতিহাস মাত্র। আর্যাবর্তের প্রাচীন সংস্কৃতিতে নামের পরে পদবি নয়, বরং নামের পূর্বে ‘শ্রী’ ও ‘শ্রীমতী’ ব্যবহারের রীতি ছিল।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীরামচন্দ্র কিংবা শ্রী হনুমানের মতো আদর্শিক চরিত্রদের নামের পূর্বে ‘শ্রী’ যুক্ত থাকার মাধ্যমেই আমরা তাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও দিব্যতা প্রকাশ করি। নারীদের ক্ষেত্রেও ‘শ্রীমতী’ শব্দটি একইভাবে সম্মান ও আভিজাত্যের প্রতীক।
বর্তমান সময়ে আধুনিকতার ভিড়ে আমরা কি এই ঐতিহ্যবাহী সম্বোধনগুলো হারিয়ে ফেলছি? এই উদাসীনতা কি প্রকারান্তরে আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়কেই সংকটে ফেলছে না তো ?
সময়ের বিবর্তনে আধুনিকতার মোড়কে আজ সনাতনী ভাই-বোনদের মধ্যে নিজেদের নামের পূর্বে ‘শ্রী’ ও ‘শ্রীমতী’ ব্যবহারে এক অদৃশ্য অনীহা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, জাতীয় পরিচয়পত্র থেকে শুরু করে শিক্ষা জীবনের সার্টিফিকেট—সর্বত্রই এই গৌরবময় সম্বোধনগুলো আজ প্রায় বিলুপ্ত। এটি কেবল একটি শব্দের বিদায় নয়, বরং আমাদের জাতীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ঘোর অমানিশার সংকেত।
কোনো জাতি যখন তার ঐতিহ্যের শেকড় ত্যাগ করে, তখন সে আর প্রাণবন্ত থাকতে পারে না। আমরা আজ নিজেদের পূর্বপুরুষদের সেই সুশৃঙ্খল ধারাবাহিকতা বিসর্জন দিয়ে কেবল ‘পদবি’র মিথ্যা অহংকারে মদমত্ত হয়ে উঠছি। নামের শেষে কী আছে, সেই বাহ্যিক আভিজাত্য খুঁজতে গিয়ে আমরা নামের আদিতে থাকা আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক শ্রী হারিয়ে ফেলছি। এই আত্মবিস্মৃতি আমাদের এক আত্মবিনাশী পরিণামের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
পরিশেষে বলা যায়, ‘শ্রী’ বা ‘শ্রীমতী’ কেবল নামের অগ্রভাগের কোনো অলঙ্কার নয়; এটি আমাদের সনাতনী জীবনাচরণ ও আত্মিক আভিজাত্যের স্মারক। আধুনিকতার অন্ধ অনুকরণের চেয়ে নিজের শেকড়কে আঁকড়ে ধরাতেই প্রকৃত সার্থকতা নিহিত। যদি আমরা আমাদের এই গৌরবময় ঐতিহ্যকে বিস্মৃত হতে দিই, তবে অদূর ভবিষ্যতে আমরা এক পরিচয়হীন ও দিশেহারা জাতিতে পরিণত হবো। তাই সময় এসেছে আত্মজিজ্ঞাসার আমরা কি সস্তা আধুনিকতার স্রোতে গা ভাসিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব বিলীন হতে দেব, নাকি নামের পূর্বে সেই হারিয়ে যাওয়া ‘শ্রী’ ফিরিয়ে এনে পুনরায় নিজেদের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করব? মনে রাখা প্রয়োজন, বৃক্ষ যখন তার শেকড় হারায়, তখন তার পতন অনিবার্য, তেমনি জাতির বেলাতেও এই সত্য ধ্রুব।
Run with #veda
0 মন্তব্যসমূহ