"দ্য আল্টিমেট কিং মেকার" - আর্যশ্রেষ্ঠ শ্রীকৃষ্ণ
"সিংহাসনে বসা মানুষটি রাজা হতে পারেন, কিন্তু যিনি ঠিক করেন সিংহাসনে কে বসবে—তিনিই মুকুঠহীন সম্রাট"
প্রাচীন সাম্রাজ্যের ইতিহাসে সিংহাসন দখলের লড়াই সম্পর্কে ধারণা আমাদের মতো ইতিহাস প্রেমীদের নখদর্পণে। রোমান সাম্রাজ্যের সিংহাসন দখলের স্বপ্নে শীর্ষ ৬০ জন সিনেটর কর্তৃক জুলিয়াস সিজারের কুখ্যাত হত্যাকাণ্ড কিংবা মোঘল সাম্রাজ্যের সিংহাসন দখলের জন্যে সম্রাট শাহজাহান এর উত্তরসূরী আওরেঙ্গজেব কর্তৃক নিজ ভ্রাতা দারা শিকোহ এর শিরশ্ছেদ কিংবা বাংলার পরাধীনতার শেকল পড়ানো সেই প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন। ইতিহাসে সিংহাসন দখলের লড়াইে ভাতৃঘাতী, বিশ্বাসঘাতকতার অজস্র উদাহরণ দেওয়া সম্ভব - যার প্রধান লক্ষ্য "সাম্রাজ্যের সিংহাসন"।
তবে ইতিহাসে কিছু ভিন্ন মতাদর্শের দৃষ্টান্ত আমাদের চোখে পড়ে। নগণ্য হলেও, এমন দৃষ্টান্ত অনন্য ও গুরুত্ব ছিল সুদূরপ্রসারী। যেখানে রাজার সিংহাসন অপেক্ষা সিংহাসনে আসীন কে হবে তা নির্ধারণ করা ব্যক্তি "মুকুঠহীন সম্রাট বা দ্য আল্টিমেট কিং মেকার"। যেখানে সিংহাসন নয় বরং সাম্রাজ্যের স্থিতিশীলতা, প্রগতি ও শক্তিশালী হিসেবে গড়ে তোলা মূখ্য উদ্দেশ্য । আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় যা "অদৃশ্য কর্তৃত্ব" বা Shadow Authority" হিসেবে অভিহিত হয়ে থাকে। এই রাজনৈতিক টার্মে পদ-পদবী নয় বরং আড়ালে থেকে দায়িত্ব পালনই মূখ্য। এমন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে "এমিনেন্স গ্রিজ বা গ্রে এমিনেন্স" বলা হয়।
"রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় আর্যশ্রেষ্ঠ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন একাধারে একজন 'Eminence Grise' এবং ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ 'Kingmaker'। তিনি কোনোদিন রাজমুকুট পরেননি ঠিকই, কিন্তু তাঁর 'Shadow Power' বা পর্দার আড়ালের শাসনই সে যুগের রাজনীতির গতিপথ বদলে দিয়েছিল।"
🔆 অনবদ্য মাস্টার স্ট্র্যাটেজিস্ট :
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি অতি প্রাচীন অথচ কার্যকর তত্ত্ব হলো "Power behind the throne" বা সিংহাসনের অন্তরালে আসল শক্তির অবস্থান।আর্যশ্রেষ্ঠ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন এই তত্ত্বের সার্থক রূপকার। তাঁর রাজনীতি ছিল অনেকটা দাবা খেলার মতো, যেখানে তিনি নিজে দাবার কোনো ঘুঁটি ছিলেন না, বরং ছিলেন সেই খেলোয়াড় যাঁর নির্দেশে চালিত হতো প্রতিটি ঘুঁটি।
মথুরায় কংস বধের পর আর্যশ্রেষ্ঠ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সিংহাসনে আরোহন করেননি, তা কোনো মূর্খতা নয় বরং তা ছিল এক সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক কৌশল। তিনি জানতেন, সরাসরি শাসক হলে তাঁকে রাজধর্ম ও প্রোটোকলের শিকলে বন্দি হতে হবে। কিন্তু ‘মাস্টারমাইন্ড’ বা পর্দার আড়ালে থাকলে তিনি সম্পূর্ণ আর্যাবর্তের রাজনীতিকে ধর্ম ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করার এক বিশাল স্বাধীনতা পাবেন। এই রাজনৈতিক দূরদর্শিতা তিনি যুধিষ্ঠিরকে চক্রবর্তী সম্রাট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রেও স্মরণ রেখেছিলেন। আর্যশ্রেষ্ঠ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজে চাইলেই মগধরাজ জরাসন্ধকে হত্যা করে চক্রবর্তী সম্রাট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারতেন। কিন্তু ক্ষমতালিপ্সা নয় বরং আর্যাবর্তের ভবিষ্যত নির্মাণই ছিল একমাত্র উদ্দেশ্য। সেজন্য, তিনি ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে ইন্দ্রপ্রস্থের সিংহাসনে চক্রবর্তী সম্রাট হিসেবে আসীন দেখতে চেয়েছিলেন।
🔆 পলায়নবাদ বনাম কৌশল - Escapism vs Strategy :-
মগধরাজ জরাসন্ধ শুধুমাত্র অত্যাচারী চক্রবর্তী সম্রাট ছিলেন নাহ বরং দ্বারকার জন্য ছিলেন হুমকিস্বরূপ। যিনি মথুরায় ১৭ বার আক্রমণ করেন। ফলস্বরূপ, সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিতে নগরী মথুরা থেকে সরিয়ে দ্বারকায় স্থাপন করেন। যেখান থেকে তাকে "রণছোড়" সম্বোধন করা হয়। তবে আপেক্ষিক দৃষ্টিতে এই সিদ্ধান্ত ভীরুতা মনে হলেও তা ছিল সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক ও সামরিক কৌশল বা Strategic Retreat. কারণ, তীরকে ছোঁড়ার পূর্বে পিছনে টানতে হয়, তেমনি রণাঙ্গন থেকে সরে এসে ভিন্নরূপে শত্রুদের পরাস্ত করাও সামরিক কৌশলের অংশ। তিনি মথুরার সংকীর্ণতা থেকে বেরিয়ে সমুদ্রের বুকে নিরাপদ ও দুর্ভেদ্য ‘দ্বারকা’ গড়ে তুলেছিলেন, যা ছিল তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয়। তিনি পিছিয়ে এসেছিলেন যাতে চূড়ান্ত আঘাতটি আরও নিখুঁতভাবে করা যায়। আর তার প্রমাণ পাওয়া যায় যখন তিনি সরাসরি যুদ্ধ না করে কৌশলে ভীমের মাধ্যমে জরাসন্ধের দর্প চূর্ণ করেন। জরাসন্ধকে বধ করার জন্য তিনি ১৮তম যুদ্ধে সরাসরি না জড়িয়ে পাণ্ডবদের মাধ্যমে প্রক্সিযুদ্ধে জরাসন্ধকে নিকেশ করেছিলেন। সেজন্য রাজনীতির প্রেক্ষিতে এই মুভকে বলা উচিত,
"His departure from Mathura was not an act of Escapism, but a masterpiece of Strategic Retreat."
ক্ষমতার মসনদে উগ্রসেন থাকলেও আর্যাবর্তে তিনিই দ্বারকাধীশ হিসেবে সম্বোধিত হতেন তবুও সিংহাসনের প্রতি ছিল নাহ কোনো মোহ কিংবা লিপ্সা। নিজে দ্বারকার সিংহাসনে আসীন নেই কিংবা চক্রবর্তী সম্রাট হওয়ার কোনো অভিলাষ নেই তবুও দ্বারকাকে সুরক্ষিত করতে ও আর্যাবর্তে ধর্ম-ন্যায়-সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অনবদ্য মাস্টার স্ট্র্যাটেজিস্ট।
🔆 মথুরা থেকে কুরুক্ষেত্র - সারথি যখন স্ট্র্যাটেজিক কনসালটেন্ট:-
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে আর্যশ্রেষ্ঠ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন অস্ত্রহীন কিন্তু বাস্তবিক প্রেক্ষাপটে তিনি ছিলেন "The Architect of Victory"। তিনি প্রমাণ করে দিয়েছিলেন রণাঙ্গনে অস্ত্র নয়, শৌর্যবীর্য নয় বরং অব্যর্থ মস্তিষ্কই বিজয় অর্জন এনে দিতে পারে। যুদ্ধে সেনাপতি হিসেবে নয়, নিজেকে স্থান দিয়েছিলেন অর্জুনের রথের সারথির পদে। কিন্তু সারথি রুপে তিনি ছিলেন অর্জুনের Strategic Advisor ও Mentor. অর্জুন যখন দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন, তখন শ্রীমদ্ভগবদগীতার বাণীর মাধ্যমে তাঁকে কর্মে উদ্বুদ্ধ করা ছিল এক অনন্য 'Motivational Leadership'. যে যুদ্ধ ছিল আধুনিক সমরবাদ এর ভাষায় Asymmetric Warfare বা অসম যুদ্ধ, সে যুদ্ধে বিজয়ের ইতিহাস রচয়িতা আর্যশ্রেষ্ঠ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। অস্ত্রহীন সারথি ছিলেন যুদ্ধের Strategic Advisor, যার রণকৌশল কৌরবদের সকল ক্ষুরধার রণনীতি ব্যর্থ প্রমাণিত হয়। ১৮ অক্ষৌহিণী সৈন্যের সেই রক্তসমুদ্রে তিনি একমাত্র ব্যক্তি, যাঁর হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না কিন্তু তিনি নির্ধারণ করছিলেন যুদ্ধের পরিণতি। এ যেন কুরুক্ষেত্র নামক শতরঞ্জ বা দাবার বোর্ডের একচ্ছত্র অধিপতি। যখনই পাণ্ডবপক্ষ খাদের কিনারে দাঁড়িয়েছে, তখনই তাঁর সেই ক্ষুরধার অথচ অব্যর্থ মস্তিষ্ক জন্ম দিয়েছে এক একটি ‘মাস্টারস্ট্রোক’। অজেয় ভীষ্মের অপরাজেয় সংকল্প হোক বা গুরু দ্রোণাচার্যের দিব্যাস্ত্র কিংবা অঙ্গরাজ কর্ণের দূর্ভেদ্য বর্ম - দ্বারকাধিপতির রহস্যময় Psychological Warfare এ ধুলোয় মিশেছে কৌরবদের অহংকার। তার প্রতিটি মাস্টারস্ট্রোক প্রমাণ করেছে যে, রণাঙ্গনে লাখো সৈন্যের চেয়ে একজন ‘মাস্টারমাইন্ডের’ নীরব পরিকল্পনাই বেশি ঘাতক। পাণ্ডবদের জয় নিশ্চিত করে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, রণাঙ্গনে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রটি তলোয়ার নয় - বরং সেটি হলো একটি অব্যর্থ মস্তিষ্ক। ধর্মের প্রতিষ্ঠা করে, বিজয় ধ্বজা উড়িয়ে, পাণ্ডবদের সিংহাসনে বসিয়ে তিনি যখন যুদ্ধের শেষে নির্লিপ্তভাবে নিজের রথ থেকে নামছিলেন, তখন আর্যাবর্ত বুঝেছিল - বিজয় অস্ত্রের শক্তিতে আসেনি, এসেছে সেই ‘অদৃশ্য সুতোর টানে’, যা শ্রীকৃষ্ণ নিজের আঙুলে পেঁচিয়ে রেখেছিলেন। তিনি কোনোদিন মুকুট পরেননি, কিন্তু কুরুক্ষেত্রের প্রতিটি মুহূর্ত সাক্ষী হয়ে ছিল যে, তিনিই এই কুরুক্ষেত্রের একমাত্র ‘The Architect of Victory’।
দ্বারকা থেকে কুরুক্ষেত্র—সর্বত্রই তাঁর উপস্থিতি ছিল একজন 'Eminence Grise' মতো, যিনি মুকুটহীন হয়েও মুকুটধারীদের ভাগ্য নির্ধারণ করেছিলেন। এই ‘অদৃশ্য কর্তৃত্ব’ প্রমাণ করে যে, প্রকৃত ক্ষমতা পদের লালসায় নয়, বরং বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্য এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার মধ্যে নিহিত থাকে।
🔆 মুকুটের ঊর্ধ্বে এক শাশ্বত অধিপতি:
পরিশেষে বলা যায়, শ্রীকৃষ্ণের এই ‘সিংহাসন বিমুখ’ রাজনীতি কোনো বৈরাগ্য ছিল না, বরং তা ছিল এক উচ্চতর চেতনার বহিঃপ্রকাশ। জুলিয়াস সিজার, আওরঙ্গজেব কিংবা মীরজাফররা ইতিহাসের পাতায় স্থান পেয়েছেন ক্ষমতার দাপটে অথবা বিশ্বাসঘাতকতায়। কিন্তু ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ইতিহাসের ঊর্ধ্বে স্থান করে নিয়েছেন ক্ষমতার নির্লিপ্ততায়। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন যে, প্রকৃত নেতৃত্ব কোনো রাজকীয় ডিক্রিতে নয়, বরং মানুষের আস্থা ও আদর্শের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে থাকে। বর্তমান সময়ের বিশৃঙ্খল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত পদের লালসায় কলুষিত, সেখানে এই ‘মুকুটহীন সম্রাটের’ দর্শন যেন এক আলোর দিশারি। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, রাজদণ্ড হাতে না নিয়েও মহাকালের গতিপথ পরিবর্তন করা যায়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কোনোদিন রাজা হননি ঠিকই, কিন্তু তিনি রাজাদেরও ভাগ্যবিধাতা বা ‘The Ultimate Kingmaker’ হয়ে কোটি মানুষের হৃদয়ে এবং ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে আজীবন অধিষ্ঠিত রইলেন। তাঁর এই ‘অদৃশ্য রাজত্ব’ কেবল একটি রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং এটিই ছিল ধর্মের প্রকৃত বিজয়। কারণ,
"ইতিহাস রাজাদের মনে রাখে, কিন্তু বিশ্ব মনে রাখে সেই কারিগরকে, যিনি রাজাদের তৈরি করেন।"
#Veda

0 মন্তব্যসমূহ