"সতীদাহ - বেদবিরুদ্ধ এক কুপ্রথা"
🔆 সময়ের আবর্তে মনুষ্য সমাজ আজ জ্ঞান, মুক্তচিন্তা ও যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অগ্রগামী। কুসংস্কার দূর করে, উন্নত ও যুক্তিনির্ভর মানবসভ্যতার বিনির্মানে বদ্ধপরিকর। নারী-পুরুষ উভয়ের সম্মিলিত অবদানে এগিয়ে চলেছে মনুষ্য সভ্যতা। পূর্বের বদ্ধধারণা পরিত্যাগ করে নারীবান্ধব সমাজ গঠনে ও সর্বক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতায়নে সকলেই সুচিন্তক। সনাতন ধর্মশাস্ত্রে নারীর এই মর্যাদা প্রতিষ্ঠা ও ক্ষমতায়নের চেষ্টাকে অনুপ্রাণিত করে। সেজন্য, বেদে নারীকে যোদ্ধা, শাসক এবং জ্ঞানের ধারক রুপে সম্বোধন করা হয়েছে। ফলশ্রুতিতে, নারী কখনো ঋষি রুপে, কখনো রাজ্যের শাসনকর্তা রুপে এগিয়ে এসেছে বহুবার। সে মহীয়সী নারীদের জানাই সশ্রদ্ধ প্রণাম।
🔆 তবে জল যেমন প্রবাহিত হতে হতে কখনো কৃত্রিম বাঁধের কারণে বাধাগ্রস্ত হয়, তেমনি সমাজ এগিয়ে চলতে গিয়ে কখনো কখনো বাধাগ্রস্ত হয়, যা নিয়ে আসে বিপর্যয়। যা রোধ না করে, কখনো এগোনো যায় নাহ । সে বিপর্যয়ের অপরনাম 'কুসংস্কার'।
📌 প্রতিটি সমাজে বিবিধ কুসংস্কার বিদ্যমান ছিল। উদাহরণস্বরূপ, আফ্রিকায় এখনো কুমারিত্ব পরীক্ষার নামে একটি সামাজিক কুপ্রথা রয়েছে। যা মানবাধিকার কর্মীদের নিকট অত্যন্ত নিন্দাসূচক হিসেবে সম্বোধিত। কারণ, সে প্রথার রীতিনীতি যথেষ্ট বর্বর। ইতিহাসে এমন বহু কুপ্রথা বিদ্যমান ছিল। ভারতীয় উপমহাদেশে নারীদের প্রতি সবচেয়ে মানবতাবিরোধী যে কুপ্রথা প্রচলিত ছিল তা "সতীদাহপ্রথা"। শত-শত নারীর জীবনের সমাপ্তি ঘটেছিল সে সর্বগ্রাসী চিতার আগুনে।
🔆 সতীদাহপ্রথা প্রথার শুরু ঠিক কখন থেকে তা বলা সম্ভব নয়। তবে এই প্রথা যে মহাভারত কিংবা রামায়ণের যুগ থেকে হয়ে আসছে এমন কোনো উল্লেখ নেই। মহাভারত ১২।৪২।১০ অনুসারে,
"যুদ্ধের পরে যেসব নারীর স্বামী বা পুত্র যুদ্ধে মারা গিয়েছিল তাদের সবাইকে দয়ালু কুরুবংশীয় রাজা যুধিষ্ঠির সম্মানের সাথে লালন-পালন করতেন।"
অর্থাৎ কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পরে বিধবা নারীরা সম্মান এর সাথে জীবনযাপন করতেন। বাল্মিকী রামায়ণেও রাজা দশরথের মৃত্যুর পরে মাতা কৌশল্যা, কৈকেয়ী ও সুমিত্রার ক্ষেত্রে সতীদাহপ্রথার উল্লেখ পাওয়া যায় নাহ।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিধবা নারীদের সহমরণ কোনো আবশ্যিক ছিল নাহ। বরং, ইতিহাসবিদদের মতে সতীদাহপ্রথা শুরু হয়েছিলো রাজ্যে বহিঃশত্রু আক্রমণের হাত থেকে নিজের সম্ভ্রম রক্ষার্থে আত্মবিসর্জন এর মাধ্যমে। আমরা ইতিহাসে এমন বর্ণনার উল্লেখ খুঁজে পাই যেখানে, রাজ্যের শাসক পরাজিত হওয়ার কারণে রাণী কিংবা দাসদাসীসহ অন্যান্য নারীরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করতে জ্বলন্ত আগুনে নিজেকে সমর্পিত করার মাধ্যমে। যা জওহর হিসেবে সম্বোধিত। রাজপুত নারীরা শাসকের চূড়ান্ত পরাজয়ের পরবর্তীতে নিজেদের এই আত্মহননের পথ অনুসরণ করতো। তবে সকলেই পথ অনুসরণ করতো নাহ। কিন্তু এই আত্মহনন ছিল বীরত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, ১৩০৩ সালে আলাউদ্দিন খিলজির চিত্তৌড় গড় আক্রমণকালে রাণী পদ্মিনী জওহর এর ঘটনা ইতিহাসখ্যাত, এছাড়াও ১৩২৬ সালে তুঘলক রাজবংশের রাজত্বকালেও এমন ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। জয়সলমের জৌহরের দুটি ঘটনার সাক্ষী রাজস্থানের স্থানীয় গীতিনাট্য ও লোককাহিনীতে এই অনুশীলনকে মহিমান্বিত করা হত। জওহর এর উদ্দেশ্য ছিল, কোনো ভাবে আক্রমনকারীর নিকট নিজের সম্ভ্রম না হারানো। সম্ভ্রম হারানোর চেয়ে, মৃত্যু শ্রেয় এমনই ছিল এই বিষয়ের উদ্দেশ্য। কিন্তু সামগ্রিক সমাজে এর বিস্তৃতি ছিল নাহ। তবে ধীরে ধীরে এই সহমরণ সমাজে প্রচলিত হতে থাকে। উল্লেখ্য যে, পূর্বেও সহমরণ বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত হয়েছে। গ্রিক লেখক ডিওডোরাস সিকুলাস (Diodorus Siculus), যিনি খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দ-এর আশেপাশে ভারতে এসেছিলেন, তাঁর লেখায় সতীদাহের বিচ্ছিন্ন ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায় এবং গুপ্তযুগে এই প্রথার প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায় হলো খ্রিস্টাব্দ ৫১০ সালে মধ্যপ্রদেশের এরান-এ পাওয়া শিলালিপিতে, যেখানে গোপরাজা নামে এক গুপ্ত সেনাপতির স্ত্রীর সতী হওয়ার ঘটনা লিপিবদ্ধ আছে। কিন্তু জওহর এর প্রভাবে ধীরে ধীরে এই ঐচ্ছিক সহমরণ পরিবর্তন হয়ে সামগ্রিক সমাজে আবশ্যিক সংস্কারে পরিণত হয়।
কিন্তু সহমরণ বা সতীদাহপ্রথা কোনো বেদভিত্তিক সিদ্ধান্ত ছিল নাহ। কারণ, বেদে নারীর স্বামীর মৃত্যু পরবর্তী সময়ে পুনঃবিবাহের উল্লেখ রয়েছে। অথর্ববেদের কান্ড ১৮, সুক্ত ১ম, মন্ত্র ৩য় বলা হয়েছে,
ইয়ং নারী পতি লোকং বৃণানা নিপদ্যত উপত্ব্য মর্ন্ত্য প্রেতম্।
ধর্মং পুরাণমনু পালয়ন্তী তস্ম্যৈ প্রজাং দ্রবিণং চেহ ধেহি।। - অথর্ববেদ ১৮/১/৩
অর্থাত্,হে মনুষ্য!এই স্ত্রী পুনর্বিবাহের আকাঙ্খা করিয়া মৃত পতির পরেতোমার নিকট আসিয়াছে।সে সনাতন ধর্মকে পালন করিয়া যাতে সন্তানাদি এবং সুখভোগ করতে পারে।
অপর আরেকটি মন্ত্রে স্বামীর মৃত্যুর পরে পুনঃ বিবাহের উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে,
"উদীষর্ব নার্ষ্যভি জীবলোকংগতাসুমেতমুপশেষ এহি।
হস্তাগ্রাভস্য দিধিষোস্তবেদং পত্যুর্জনিত্বমভ সংবভূব।। - অথর্ববেদ ১৮/৩/২, ঋগ্বেদ ১০/১৮/৮
অর্থাত্,হে নারী!মৃত পতির শোকে অচল হয়ে লাভ কি?বাস্তবজীবনে ফিরে এস।পুনরায় তোমার পাণিগ্রহনকারী পতির সাথে তোমার আবার পত্নীত্ব তৈরী হবে।
এছাড়াও তৈত্তিরীয় আরণ্যকে একই ধারণাকে স্বীকৃতি দিয়ে বলা হয়েছে,
"ইয়ং নারী পতিলোকং বৃণানা নিপদ্যত উপত্বা মর্ত্য প্রেতম।
বিশ্বং পুরাণ মনু পালয়ন্তী তস্যৈ প্রজাং দ্রবিণং চেহ ধেহি।।" - তৈত্তিরীয় আরন্যক ৬/১/৩
অর্থাত্,হে মনুষ্য!মৃত পতির এই স্ত্রী তোমার ভার্যা।সে পতিগৃহ সুখের কামনা করিয়া মৃত পতির পরে তোমাকে প্রাপ্ত হইয়াছে।কিরুপ ভাবে?অনাদি কাল হইতে সম্পূর্ন স্ত্রী ধর্মকে পালন করিয়া।সেই পত্নীকে তুমি সন্তানাদি এবং ধনসম্পত্তি সহ সুখ নিশ্চিত কর।
কিন্তু সময়ের আবর্তে বিধবা বিবাহ নিষিদ্ধ হয়ে যায়। নারীদের জীবনে পুনঃ নেমে আসে অমানিশা। স্বার্থান্বেষী, অন্ধ ব্যক্তিরা প্রচলন করে সতীদাহপ্রথা। সুদীর্ঘ সময় ধরে হাজারো নারীকে কখনো আফিমের ঘোরে তো কখনো জোরপূর্বক স্বামীর চিতায় জীবন্ত তুলে দেওয়া হতো। মৃত্যুর চিৎকারে প্রকৃতি হয়ে উঠতো ভারাক্রান্ত। সেই ক্রন্দনে অসহায় নারীদের উদ্ধারে আবির্ভূত হয়েছিলেন এক লৌহ পুরুষ - রাজা রামমোহন রায়।
১৮২৯ সালে অক্লান্ত পরিশ্রম, সংগ্রাম ও মৃত্যুভয়কে দূর করে লর্ড বেন্টিংক এর মাধ্যমে সতীদাহপ্রথা নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে সমর্থ হন। ফলস্বরূপ, এই বর্বর প্রথা ধীরে ধীরে বন্ধ হতে থাকে। পরবর্তী সময়ে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মাধ্যমে বিধবাবিবাহ পুনঃপ্রচলন শুরু হয় এবং নারীরা ফিরে পায় মুক্তি।
হে অমৃতের সন্তানগণ! সময়ের আবর্তে বহু কুসংস্কার আমাদের সমাজে অঙ্গীভূত হয়ে গিয়েছে। আমাদের মহান মনিষীগণ সে কুসংস্কার দূর করে সমাজকে দিশা দেখিয়েছেন। কিন্তু এখনো সমাজে বহু কুসংস্কার বিদ্যমান। সেসকল কুসংস্কার সমূহ আমাদের সমাজের অগ্রগতিকে রুদ্ধ করছে এবং একতাকে করছে ভঙ্গুর। সেজন্য, আমাদের সকলকে ধীরে ধীরে কুসংস্কার সমূহ দূর করে শক্তিশালী সমাজগঠনে প্রয়াস করতে হবে।
🔎Run with #veda