"শুদ্ধি আন্দোলন"
সনাতনীদের পুনরুজ্জীবিত করে বিপ্লবী পরিবর্তন ইতিহাসে বহুবার এসেছে। সনাতন বিজ্ঞ মনিষীগণ সর্বদা সনাতনীদের পথপ্রদর্শক হয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন। কখনো কুসংস্কার নির্মূল, কখনো হিন্দু নবজাগরণ ঘটানো কিংবা জাতীয়তাবাদী চেতনা গঠনে অসংখ্য মহাত্মা অবদান রেখেছেন। স্বামী বিবেকানন্দ যেমন সমগ্র বিশ্বে সনাতন এর দৃঢ়তা, উদারতা ও উত্তম স্থান তুলে ধরেছিলেন, তেমনি ধর্মত্যাগী সনাতনীদের পুনরায় সনাতনে প্রত্যাবর্তনে মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতীর মতো পূজ্য মনিষীর অবদান অনস্বীকার্য। আমরা সেসকল পুনর্জাগরণ মূলক আন্দোলনের অগ্রপথিকদের সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাই। ইতিহাসে সেসকল আন্দোলন ও নেতৃত্ব প্রদানকারী মনিষীগণ এর ইতিহাস ছড়িয়ে দিতে বদ্ধপরিকর।
সনাতনীদের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী আন্দোলন সমূহের মধ্যে "শুদ্ধি আন্দোলন" সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ও বিপ্লবী ছিল। কারণ, ইতোপূর্বে প্রতারণা, জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত সনাতনীদের প্রত্যাবর্তন ছিল দুষ্কর কিংবা অসম্ভব। কিন্তু মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী জ্বী এই প্রতিবন্ধকতাকে ভেঙে দিয়ে পরিবর্তন এর ডাক দিয়েছিলেন। স্বরাজ্য ধারণা প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে তিনি এই ভূমিপুত্রদের পুনরায় অমৃত ফেরানোর উপর জোর দেন এবং বিপ্লবী ডাক দেন "কৃণন্তো বিশ্বমার্যম"।
মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী এই ধারণা পুনঃপ্রচলন করেছিলেন কিন্তু এই ধারণা গতিলাভ করে মহর্ষির যোগ্য শিষ্য স্বামী শ্রদ্ধানন্দের মাধ্যমে। স্বামী শ্রদ্ধানন্দ মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী ও আর্য সমাজের দ্বারা এতটাই প্রভাবিত ছিলেন যে, তিনি প্রাচীন ভারতের গৌরব "বৈদিক গুরুকুল" প্রতিষ্ঠা ও গৌরব পুনরুদ্ধারে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করেন। কিন্তু তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রগামী ব্যক্তিত্বদের মধ্যে একজন। কারণ, স্বরাজ্যের স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী এবং সেজন্য স্বাধীনতা আন্দোলনে আর্য সমাজের ব্যক্তিত্বদের ভূমিকা অগ্রগণ্য। তবে স্বামী শ্রদ্ধানন্দ এসবের বাইরে সমাজ সংস্কারক ছিলেন। ফলস্বরূপ, অস্পৃশ্য কিংবা জাতিবাদের তীব্র বিরোধিতা করেন। সেই সূত্র ধরে, তিনি দলিতদের পুনরুদ্ধারে যেমন ভূমিকা পালন করেন তেমনি ধর্মান্তরিত সনাতনীদের নিজের শেকড় সনাতনে প্রত্যাবর্তনের চেষ্টা করেন। যার ফলে, শুরু হয় "শুদ্ধি আন্দোলন"। ১৯২৩ সালে, স্বামী শ্রদ্ধানন্দ ভারতীয় হিন্দু শুদ্ধি মহাসভা (ভারতীয় হিন্দু শুদ্ধি পরিষদ) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যা ধর্মান্তরিত হওয়া সনাতনীদের প্রত্যাবর্তনের গতি বৃদ্ধি এবং সনাতন ধর্মত্যাগ এর গতি হ্রাস করেছিল। স্বামী শ্রদ্ধানন্দের এই আন্দোলনের ফলস্বরূপ ভারতের আগ্রা অঞ্চলের ৪৫০০০০ এর অধিক মালকানা রাজপুতদের স্বধর্মে প্রত্যাবর্তন সম্ভব হয়েছিল। এছাড়াও উত্তর প্রদেশে আনুমানিক ১৮০০০ এর অধিক প্রত্যাবর্তন হয়েছিল যা এতদিন ছিল অসম্ভব। কিন্তু এই আন্দোলন ধীরে ধীরে কিছু গোষ্ঠীর চক্ষুশূল হয়ে উঠে। মহাত্মা গান্ধী নিজের তোষণ নীতি বজায় রাখতে পর্যন্ত স্বামী শ্রদ্ধানন্দের তীব্র বিরোধিতা করেন এবং শুদ্ধি আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থান নেন। কিন্তু স্বামী শ্রদ্ধানন্দ কখনো থেমে যাননি বরং মৃত্যু ভয়কে জয় করে এগিয়ে গিয়েছেন বীরদর্পে। ফলশ্রুতিতে, বর্তমান ও পূর্বের মতো এই আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে সন্ত্রাসী কার্যক্রমকে বেছে নেওয়া হয়। ১৯২৬ সালে আব্দুল রশিদ নামক এক আততায়ীর গুলিতে নিহত হন স্বামী শ্রদ্ধানন্দ । কিন্তু স্বামী শ্রদ্ধানন্দ যে অগ্নিশিখা প্রজ্জ্বলিত করে গিয়েছেন তা কখনো নিভে যায়নি বরং এই আলো শত শত দিশাহীন মানুষকে সনাতন এর পথ দেখিয়েছে। ১৯৩৮ সালের ২৩ শে ফেব্রুয়ারি, পর্তুগিজ শাসিত গোয়ায় গৌদ ও কুনাবি সম্প্রদায়ের অনেক ক্যাথলিক ধর্মান্তরিত অধিবাসী গীর্জা এবং পর্তুগিজ সরকারের বিরোধিতা সত্ত্বেও পুনরায় সত্য সনাতনে প্রত্যাবর্তন করে। তিসওয়াদির ৪৮৫১ ক্যাথলিক গৌডস, পন্ডার ২১৭৪ জন, বিচোলিম থেকে ২৫০ এবং সাত্তারি থেকে ৩২৯ বছর পর প্রায় ৪০০ বছর পর আবার সত্য সনাতন বৈদিক ধর্মে প্রত্যাবর্তন করে। কিন্তু এই আন্দোলনের অন্যতম দৃষ্টান্ত ছিল সেই মহাত্মা গান্ধী পুত্র হরিলাল গান্ধীর ধর্মান্তরিত হওয়া এবং আর্য সমাজের শুদ্ধি যজ্ঞের মাধ্যমে স্বধর্মে প্রত্যাবর্তন করা। ধর্মান্তরিত হওয়ার পরে মহাত্মা গান্ধীর ছিলেন নিজের তোষণ নীতিতে অটল কিন্তু মা কস্তুরবা আর্য সমাজের নিকট শরণাপন্ন হয়েছিলেন মুম্বাইয়ের আর্য সমাজের বিজয় শঙ্কর ভট্টের নিকট। সেদিন মায়ের আঁচল পেতে সন্তানকে চেয়েছিলেন , বিজয় শঙ্কর ভট্ট মায়ের চাওয়া ফিরিয়ে দেননি বরং তার সন্তানকে পুনরায় ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। যুক্তিতর্ক ও সত্য উপস্থাপনের ফলে হীরালালের আত্মগ্লানি হয় এবং উন্মুক্ত মাঠে সকলের সামনে স্বধর্মে প্রত্যাবর্তন করেন।
আর্য সমাজ এই শুদ্ধি যজ্ঞের মাধ্যমে এখনো বহু পথভ্রষ্ট সনাতনীদের অমৃতে প্রত্যাবর্তন করে থাকে। সনাতনীদের ইতিহাসে শুদ্ধি আন্দোলন এক অবিস্মরনীয় আন্দোলন যা সনাতনের পুনর্জাগরণ ঘটিয়েছিল।
সনাতনীদের যুগান্তকারী আন্দোলন: ০১