"যত দোষ এই ধর্মের,
যত সংঘাত ধার্মিকদের মধ্যে"
বর্তমান সময়ে সংশয়বাদী কিংবা নিরীশ্বরবাদীদের অন্যতম বিরোধিতা করার চেষ্টায় উচ্চারিত একটি বাক্য হলো "যত দোষ এই ধর্মের, যত সংঘাত ধার্মিকদের মধ্যে"। কারণ, এ পৃথিবীতে অতীত থেকে বর্তমান যতপ্রকার সংঘাত, ঘৃণা ও বিদ্বেষপূর্ণ কর্মকাণ্ড দেখা যায়, সেকল কর্মকাণ্ড ধর্মসমূহকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। মূল বক্তব্য ছিল :-
"এই পৃথিবীতে নাস্তিক অপেক্ষা আস্তিক এর সংখ্যা বেশি। কিন্তু অধিকাংশ সংঘাত, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বিদ্বেষ ধার্মিকদের মধ্যে। ক্রুসেড থেকে হলোকাস্ট সকল ক্ষেত্রে ধর্মই ছিল প্রধান কারণ। সেজন্য, যে ধর্ম সমূহকে শান্তিরধর্ম কিংবা সাম্যবাদ, সৌহার্দ্যের দৃষ্টিতে দেখা হয়, তা অমূলক এবং অন্যায্য দাবি"
কিন্তু সংশয়বাদীদের এমন দাবির কি কোনো প্রত্যুত্তর আছে, নাকি এটা যৌক্তিক অভিযোগ ও প্রমাণিত সত্য ⁉️
কোনো দাবি সত্য প্রমাণ করার জন্য নিঃসন্দেহে একটি শক্ত ভিত্তির ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু একপাক্ষিক অভিযোগ কোনো ভাবে মান্যতা পেতে পারে নাহ। কারণ, উপর্যুক্ত কারণ অনুসন্ধান না করে শুধু বহিঃআবরণের প্রলেপ দেখে মন্তব্য করা অযৌক্তিক ও বিভ্রান্তিকর।
আমরা ইতোপূর্বে ধর্ম ও ধর্মের স্বরুপ সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা দেওয়ার প্রয়াস করেছি। ফলশ্রুতিতে, আমরা ইতোমধ্যে অবগত যে ধর্ম ও রিলিজিয়ন উভয়ই আলাদা আলাদা সত্তা ও ধারণাকে প্রকাশ করে। ফলস্বরূপ, ধর্ম যেখানে সার্বজনীন, বিশ্বভাতৃত্ব, সাম্যবাদ এর মতো অকৃত্রিম আদর্শের ধারক, সেখানে রিলিজিয়ন সৃষ্টি করে সম্প্রদায় ও গোষ্ঠী। এইক্ষেত্রে, আমরা সকলে জানি এই পৃথিবীতে প্রতিটি সম্প্রদায় নিশ্চিতভাবে অপর সম্প্রদায় ও গোষ্ঠীর সঙ্গে মতবিরোধ, সংঘাতে লিপ্ত হবে। কারণ, আধিপত্য বিস্তার ও সাম্প্রদায়িক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের চেষ্টা রিলিজিয়ন সমূহের মধ্যেই বিদ্যমান। প্রাচীন থেকে মধ্যযুগ কিংবা বর্তমান পর্যন্ত এই ধারাবাহিকতার কোনো বিঘ্ন লক্ষ্য করা যায় নাহ। তবে ধর্ম কোনো ভৌগলিক সীমারেখা, গোষ্ঠীগত জাতীয়তাবাদ কিংবা সম্প্রদায়গত ধারণায় আবদ্ধ নয়। ধর্মশাস্ত্রে বর্ণিত বাক্যসমূহ কোনো গোষ্ঠীগত ধারণা নয় বরং যেরুপ নিউটন মাধ্যাকর্ষণ সূত্রের ধারণা প্রদান করার পরে-ও তা ইউনিভার্সাল তদরুপ ধর্মশাস্ত্র বর্ণিত বাক্য সমূহ, উপদেশ সমূহ, গুণসমূহ ইউনিভার্সাল। ধর্ম-অধর্ম, ন্যায়-অন্যায়, সত্য-অসত্য এসকল শব্দ সমূহ স্বতন্ত্র। সেজন্য এমন শব্দদ্বয়ের বিপরীত শব্দ হয় কিন্তু সে শব্দের প্রয়োগ একাধিক হয় নাহ। উদাহরণস্বরূপ, যা সত্য তাই শুধুমাত্র সত্যই, একসঙ্গে একই বস্তু বা পদার্থের একাধিক সত্য থাকতে পারে নাহ। কিন্তু রিলিজিয়ন বা পথ বা মতাদর্শ এমন একক বৈশিষ্ট্যে আবদ্ধ নয়। এক মতাদর্শের নিকট অপর মতাদর্শের বিশ্বাস গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু যা সত্য তা সকলকে স্বীকার করতে হয়। ঠিক, এইজন্য ধর্ম,সত্য,ন্যায় কোনো গোষ্ঠীগত ধারণা নয় বরং সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা প্রকার করে। ধর্মের মধ্যেই পৃথিবীর সকল সত্য, ন্যায়, বৈধতা, সদগুণ সমূহের বিদ্যমানতা।
সেজন্য, ইতিহাসে সংঘটিত রিলিজিয়ন সমূহের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারমূলক সংঘাতের সাথে ধর্মের কোনো সম্পর্ক চিন্তা করা মূর্খতা। রিলিজিয়ন সমূহের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকারী সংঘাত সমূহ বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে হয়ে থাকে। যার প্রধান উদ্দেশ্য তৎকালীন সময়ের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করা। উদাহরণস্বরূপ, মধ্যযুগে শাসকগোষ্ঠী নিজেদের চিন্তা, ধারণা ও রাজ্য দখলের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য নিজের অধীনস্থ সৈন্যবাহিনী, যোদ্ধাদের নিজেদের বিশ্বাসগত ধারণা থেকে বিভিন্ন লোভনীয়, স্বর্গীয় প্রলোভন দেখিয়ে থাকে। কিন্তু, শাসক নিজে সে বিশ্বাসের নিগূঢ় সমর্থক ছিল নাহ। মোঘল সম্রাট বাবর এর আত্মজীবনী থেকে "বাবরনামা" হতে জানা যায়। তিনি মদ্যপানে আসক্ত ছিলেন। ১৫২৭ সালে খানুয়ার যুদ্ধে বারবার পরাজিত হওয়ার পর নিজ সৈন্যদের মনোবল বৃদ্ধির জন্য শহিদ ও গাজী হওয়ার সুর্বণ সুযোগ হিসেবে তুলে ধরেন এবং মদ্যপান পরিত্যাগের শপথ করেন। ফলস্বরূপ, সে যুদ্ধে বাবার জয়লাভ করে কিন্তু পরবর্তী জীবনে নিজের মদ্যপান ও বিশ্বাসের কঠোর বিধিনিষেধ এর মধ্যে কখনো আবদ্ধ থাকেননি। শুধু মোঘল সম্রাটদের মধ্যে এরূপ প্রবণতা ছিল তা নয় বরং ঐতিহাসিক ক্রুসেডের ক্ষেত্রেও একই বিষয় লক্ষ্য করা যায়। ১০৯৫ খ্রিস্টাব্দে পোপ আরবান দ্বিতীয় প্রথম ক্রুসেডের সূচনা করেন। নিজ সৈন্যদের মনোবল বৃদ্ধি ও বিজয় লাভের উদ্দেশ্যে পাপমোচন ও স্বর্গীয় পুনরুদ্ধারের ধারণা দেন। রিলিজিয়ন সমূহের মধ্যে এরূপ ধারণা ও বিস্তারের জন্য নেতৃত্বদানকারীর জন্য এ এক অমোঘ কৌশল। অর্থাৎ, রিলিজিয়ন সমূহের বিশ্বাসের মাধ্যমে শাসকরা নিজেদের রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তগত, রাজ্য সম্প্রসারণ করতো।
তবে ধর্মের স্বরুপ এই বিষয়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কারণ, ধর্ম সেটা যা ন্যায়, সত্য ও কল্যাণের জন্য করা হয়ে থাকে। মনুষ্যের জন্য ধর্ম সার্বজনীন। যা অপরের ক্ষতি করা, আগ্রাসন করা, জবরদখল ও লুট পাটের ন্যায্যতা দেয় নাহ। বরং, মনুষ্যের প্রতি অপর যেকোনো মনুষ্যের কৃত অন্যায়কে অধর্ম হিসেবে সম্বোধিত করে থাকে। রিলিজিয়ন এর ধারণার মতে ধর্ম কোনো আত্মবলিদান কিংবা যুদ্ধে নিহত হওয়ার কারণে স্বর্গীয় প্রলোভন নেই। বরং, ধর্মে সে যুদ্ধকে ন্যায়সঙ্গত বলা হয়েছে যা মানবের জন্য, অসহায়ের রক্ষায়, পীড়িতদের মুক্তির নিমিত্তে করা হয়। ধর্মশাস্ত্রের লক্ষ্য প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা, মানুষ হিসেবে সকলের প্রতি দায়িত্ব অবগত করানো, দেশপ্রেম জাগানো, জ্ঞান অন্বেষণ করা। সেজন্য, লুটপাট, জবরদখল এর উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করা, ভিন্ন বিশ্বাসের হলে একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা এমন ধারণার কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই ধর্মে।
কিন্তু এ পৃথিবীতে সকল সংঘাত কি শুধু বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে ⁉️ অবশ্যই নাহ! সময়ের আবর্তে একসময় যা বিশ্বাসের প্রলোভন ছিল তা বর্তমানে রুপ লাভ করেছে "War-crimes" এ। সে বিষয় বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা আবশ্যক। গত শতাব্দীতে আধুনিক সময়ের প্রলয়ঙ্কারী কিছু সামরিক আগ্রাসন, গণহত্যা, স্বাধীনতা যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিলো। যেখানে কোনো ধর্মীয় মতাদর্শ কেন্দ্রীয় সংঘাত নয় বরং বিভিন্ন রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কারণই ছিল মূখ্য। উদাহরণস্বরূপ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের মাধ্যমে হলোকাস্ট নিয়ে যতটা আলোচনা হয় ততটা আলোচনা পোল্যান্ডের হত্যাকান্ড নিয়ে হয় নাহ। কিন্তু নাৎসি জার্মানি প্রায় ১.৮ মিলিয়ন (১৮ লক্ষ) থেকে ২.৭৭ মিলিয়ন (২৭.৭ লক্ষ) জাতিগত পোলিশ নাগরিককে হত্যা করে। বিপরীত দিক থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন এর আগ্রাসনের পর প্রায় ২২,০০০ পোলিশ সামরিক কর্মকর্তা ও বুদ্ধিজীবীকে সোভিয়েত গোপন পুলিশ (NKVD) হত্যা করেছিল, যা কাতিন গণহত্যা (Katyn Massacre) হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এই মানবতাবিরোধী অপরাধের কারণ কোনো ধর্মীয় বিশ্বাস ছিল নাহ। ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘাত নিয়ে আলোচনা করা হয় কিন্তু Atheism কেন্দ্রীয় মানবতাবিরোধী অপরাধ নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা হয় নাহ। বরং ইতিহাসের অন্তরালে সে সকল নিপীড়ন হারিয়ে যায়, যা সংঘটিত হয়েছিলো শুধুমাত্র তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসরণ করা কারণে। এরূপ দমনপীড়নের সেনাপতি রুপে লেলিনবাদী স্ট্যালিন এর নাম সর্বাগ্রে থাকবে। কমিউনিস্ট নেতা স্ট্যালিন কঠোর হস্তে যেমন ধর্মীয় বিশ্বাসকে দমনকে তৎপর ছিলেন, তেমনি দ্য গ্রেট পার্জ বা মহা শুদ্ধিকরণ (১৯৩৬-১৯৩৮) এর মাধ্যমে ৭-১২ লক্ষ লোককে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়েছিলো। শুধু স্ট্যালিন নয় বরং চীনের মাও জে দং, কম্বোডিয়ার পল পট, ভিয়েতনামের হো চি মিন, রোমানিয়ার নিকোলাই চওসেস্কু মতে ক্ষমতাশালী কমিউনিস্ট নেতারা ধর্মীয় বিধিনিষেধ এর উপর কঠোর হস্তক্ষেপ এবং নিজেদের লোকের উপর চালিয়েছিলেন মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের স্টিমরোলার। সে সকল নেতারা কিন্তু না ধার্মিক ছিলেন, নাহ কোনো বিশ্বাসের অনুসারী ছিলেন। পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র উভয়ের সংঘাতে সমগ্র বিশ্ব পরিণত হয়েছিলো রণাঙ্গনে। জাপান পার্ল হারবারে আক্রমণের উদ্দেশ্য কোনো বিশ্বাসের আধিপত্য ছিল নাহ বরং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থই ছিল মূখ্য। কিন্তু চেতনাবাহীদের নিকট রিলিজিয়াস কনফ্লিক্ট একমাত্র দৃষ্ট হয়। বিশ্বাসের আড়ালে রাজনৈতিক আগ্রাসন ও স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্য দৃষ্টিগোচর হয় নাহ।
জাতীয়তাবাদের অন্তরালেও মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়েছে, সংঘাত হয়েছে। হিটলারের প্রোপাগাণ্ডামূলক প্রচার বিশুদ্ধ আর্য তত্ত্ব দ্বারা যেমন সমগ্র ইউরোপে হয়েছে, তেমনি বর্তমান সময়ের সবচেয়ে সভ্য দেশ জাপান তৎকালীন চীনের রাজধানী নানচিং এ চালিয়েছিলো "নানচিং গণহত্যা" যেখানে ৩ লক্ষাধিক মানুষ গণহত্যার শিকার হয়। জাপানিজ বাহিনী "চীন ও কোরিয়ার" নারীদের আটক করে যৌনদাসীতে পরিণত করেছিলো যাদের কমফোর্ট উইমেন (Comfort Women) নামে সম্বোধন করা হতো। আনুমানিক ২ লক্ষাধিক নারী এই বর্বরতার শিকার হয়। শুধু তাই নয় বরং ইউনিট ৭৩১ (Unit 731) জীবিত মানুষদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের উপর জৈবিক পরীক্ষা চালিয়েছে। ফলশ্রুতিতে, ৫ লাখ ৮০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছিল। কিন্তু এইসকল হীন কর্মকাণ্ড কোনোটি ধর্মের জন্য হয়নি নাহ রিলিজিয়ন এর নামে হয়েছে।
পরিশেষে এতটুকুই জানানো আবশ্যক, যেকোনো দাবির ন্যায্যতা থাকা আবশ্যক। এই পৃথিবীতে সংঘাত এর সৃষ্টি অন্ন থেকে আধিপত্য বিস্তার। ধর্ম যে ধারন করে সে ধার্মিক, সে ধার্মিক এর পক্ষে অধার্মিক এর মতো কর্ম করা সম্ভব নয়৷ কারণ, অন্যায়, অবিচার, প্রতিহিংসার অধিকারী হলে সে ধার্মিক হতে পারে নাহ৷ বিষয়টি এমনই যে, মানুষটি সৎ কিন্তু সে ঘুষ বা উৎকোচ গ্রহণ করেছে। তাহলে সে মানুষ আর সৎ থাকে কি কর? ধর্মশাস্ত্রে ধর্মের উপদেশ সমূহ উদ্ধৃত করা হয়েছে। কেউ যদি তা মান্য করে নিজ জীবন পরিচালনা করে তবে সে নিজেকে উত্তম মনুষ্য হিসেবে, ধার্মিক হিসেবে তুলে ধরতে পারবে। কিন্তু কেউ যদি সে ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়ন এর পরেও নিজের জীবনে কোনো পরিবর্তন না এনে অধম হয়ে থাকে সেটার দায়ভার তার নিজের, শাস্ত্রের নয়। উদাহরণস্বরূপ, আপনি ফিজিক্সের সূত্রগুলো খুব ভালো মতে অধ্যয়ন করেছেন কিন্তু নিজে সে বিজ্ঞানের সূত্র সমূহ প্রয়োগ করেননি নিজ গবেষণা কার্যে বা প্রজেক্টে। এখন, আপনার প্রজেক্ট ব্যর্থ হলে সেটা নিশ্চয়ই পদার্থবিজ্ঞান এর দোষ নাহ। সেজন্য, ধার্মিক ধর্মকপ ধারণ করে, পালন করে, ছড়িয়ে দেয় কিন্তু ধার্মিক এর লেবাসধারী কেউ ঠিক গিরগিটির মতো রুপ লাভ করে কিন্তু সে নিজ স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্য নিয়ে থাকে, ধর্মের গুণ সমূহ ধারণে নয়।