🔸গ্রন্থ বিরোধ মীমাংসা

নমস্কার। 

পবিত্র বেদ ঈশ্বর কর্তৃক প্রাপ্ত জ্ঞান। সনাতন ধর্মে পবিত্র বেদ সর্বোচ্চ এবং ধর্মের আধার স্বরুপ। সেজন্য মহর্ষি মনু বলেছেন,  

🪔“বেদোখিলো ধর্মমূলম্।”(মনুসংহিতা ২/৬)🪔

অর্থাৎ, বেদ হল হল ধর্মের মূল। ধর্মের বিষয়ে বেদ স্বতঃ প্রমাণ।

উক্ত শ্লোক থেকে এটা স্বতঃপ্রমাণিত যে বেদ মানবের দিশা স্বরুপ এবং সকল শাস্ত্রের ভিত্তি। 

কিন্তু শাস্ত্র কি❓

🔥 "শাস্ত্র" শব্দটি সংস্কৃত ভাষা থেকে উদ্ভুত যার অর্থ-" যা দ্বারা শাসিত হয়"। একটু বিস্তার করে বললে মানুষের উচ্ছৃঙ্খল ইন্দ্রিয়বৃত্তি যা দ্বারা শাসিত বা সংযমিত হয় তাই শাস্ত্র! 🔥

কিন্তু সনাতন ধর্ম পবিত্র বেদ ব্যতীত বহু গ্রন্থের অস্তিত্ব বিদ্যমান। প্রসঙ্গত, একটি সংশয় মূলক দাবি উত্থাপিত হয়ে থাকে যে যদি পবিত্র বেদ ও অন্যান্য শাস্ত্রের মাঝে বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যায় তখন কোনটি গ্রহণযোগ্য। একজন সত্যান্বেষীর নিকট কোনটি গ্রহণ করা সঠিক বা সমীচীন বলে প্রতীয়মান হবে। 

বিশ্লেষণ: 
সনাতন ধর্ম উদারচিন্তার জন্য সুপ্রসিদ্ধ। ইহাতে প্রশ্নকর্তাকে ধর্মবিরুদ্ধকারী হিসেবে আখ্যা হয় না। বরং এখানে রয়েছে জ্ঞানের আরাধনা। পরমাত্মাকে জ্ঞানের উৎস ভেবে জ্ঞানের আরাধনা, উপলব্ধি ও মিথ্যাকে খন্ডন সবই বিদ্যমান। তাহলে এরুপ সংশয়ের সদুত্তর কি? 
আমরা এরুপ সংশয়কে দুইভাবে বিশ্লেষণ করার প্রয়াস করো। ১. যৌক্তিক ২. শাস্ত্রীয় 

যৌক্তিক: 

উদাহরণস্বরূপ আমরা একটি দেশের সংবিধানকে কল্পনা করতে পারি। একটি দেশ কিভাবে পরিচালিত হবে, জনগণের অধিকার, আইনের ব্যাখ্যা তার সবই সংবিধানের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠে। যদি কোনো আইন বা সরকারের কার্যক্রম সংবিধান বিরুদ্ধ হয় তাহলে তা বাতিল বলে বিবেচিত হয়। অর্থাৎ, এখানে মূল বিচার্য বিষয় সংবিধানকে ভিত্তি হিসেবে গণনা হয়ে থাকে। সেই রুপ পবিত্র বেদ মানব জাতির সংবিধান। ঈশ্বর কর্তৃক প্রদানকৃত তথা ঋষিগণ কর্তৃক প্রাপ্ত সে অমৃত জ্ঞান হলো পবিত্র বেদ। সেজন্য পবিত্র বেদ শুধুমাত্র ঐশ্বরিক জ্ঞান। ফলস্বরূপ, যদি কোনো স্মৃতি শাস্ত্র বা দার্শনিক গ্রন্থে পবিত্র বেদ এর বিরুদ্ধ শ্লোকের উপস্থিতি থাকে তাহলে অবশ্যই পবিত্র বেদ এর মন্ত্র গ্রহণযোগ্য হবে। কারণ সর্বদা সংবিধানই মূল ভিত্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করে। 

শাস্ত্রীয়ঃ 

পবিত্র বেদ সকল গ্রন্থের মূল। সেহেতু পবিত্র বেদ এর সিদ্ধান্ত সর্বোচ্চ বলে স্বীকৃত। 

🔸মহর্ষি অত্রি বলেছেন→
“নাস্তি বেদাত্ পরং শাস্ত্রম্।” - অত্রিস্মৃতি ১৫১📖🌼
অর্থাৎ, বেদের চেয়ে বড়ো কোনো শাস্ত্র নেই।

তাই যদি পবিত্র বেদ তথা শ্রুতির সাথে স্মৃতি বা পুরাণের বিরোধ হয় তাহলে শ্রুতির সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য। এরুপ মীমাংসা নিরসনে মহর্ষি মনু উপর্যুক্ত সিধান্ত প্রদান করেছেন। 

"শ্রুতিস্তু বেদো বিজ্ঞেয়ো ধর্মশাস্ত্রং তু বৈ স্মৃতিঃ। তে সর্বার্থেষ্বমীমাংস্যে তাভ্যাং ধর্মো হি নির্বভৌ"॥
- মনুসংহিতা ২/১০📖🌼

অর্থাৎ, 'বেদ' বলতে 'শ্রুতি' বোঝায় এবং 'ধর্মশাস্ত্রের' নাম ‘স্মৃতি'। সকল বিষয়েই (অর্থাৎ সকল রকম বিধি-নিষেধের স্থানে) এই দুই শাস্ত্র বিরুদ্ধতর্কের দ্বারা মীমাংসার অতীত, কারণ শ্রুতি ও স্মৃতি থেকেই ধর্ম স্বয়ং প্রকাশিত হয়েছে।। 

এখান থেকে স্পষ্ট যে এখানে শ্রুতি হিসেবে শুধু বেদকে বলা হয়েছে এবং স্মৃতি বলতে অন্যান্য শাস্ত্র সমূহকে বোঝানো হয়েছে। কিন্তু এই দুই শাস্ত্রে যদি তর্ক মীমাংসার অতীত হয় তাহলে কিভাবে একজন সত্যান্বেষী সত্যের অনুসন্ধানে বিরোধ নিরসণ করবেন? মহর্ষি মনু মনুসংহিতায় ১২/১০৬ শ্লোকে বলেছেন, 

"আর্ষং ধর্মোপদেশং চ বেদশাস্ত্রাবিরোধিনা । যস্তর্কেণানুসংধত্তে স ধর্মং বেদ নৈতরঃ"॥ 

 অর্থাৎ, যে ব্যক্তি বেদোক্ত ধর্মোপদেশসমূহ বেদশাস্ত্রের অবিরোধী অর্থাৎ অনুকূল তর্কের সাহায্যে অনুসন্ধান করেন অর্থাৎ নিরূপণ করতে চেষ্টা করেন, তিনিই বেদের ধর্ম অর্থাৎ বেদের অর্থ অবগত হন; এর বিপরীত স্বভাব ব্যক্তি বেদার্থধর্ম বোঝে না ।। 

উপরোক্ত শ্লোক থেকে আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে বেদোক্ত ধর্মোপদেশসমূহ বেদশাস্ত্রের অবিরোধী অর্থাৎ অনুকূল তর্কের সহিত আমরা শাস্ত্রের বিরোধ মীমাংসা করতে পারবো। যা বেদ অবিরোধী সে সকল স্মৃতি শাস্ত্র গ্রহণ করা যাবে। 

এ বিষয়ে মহর্ষি ব্যাসদেব ব্যাসস্মৃতি ১/৪ এ বলছেন, 

"শ্রুতি-স্মৃতি-পুরাণানাং বিরোধো যত্র দৃশ্যতে । 
তত্র শ্রৌতং প্রমাণন্তু তয়োর্দ্বৈধে স্মৃতিৰ্ব্বরা" ॥

- ব্যাসস্মৃতি ১/৪📖🌼

অর্থাৎ, যেখানে শ্রুতি, স্মৃতি ও পুরাণের বিরোধ দেখা যায়, সেখানে শ্ৰুতিকথিত বিধিই বলবান্ এবং যেস্থলে স্মৃতি ও পুরাণের বিরোধ দেখা যায়, সেস্থলে স্মৃতিকথিত বিধিই বলবান।

পবিত্র বেদ কে ভিত্তি স্বরুপ বিবেচনা করার কারণ রয়েছে। মহর্ষি মনু এ বিষয়ে বলেন, 

"যা বেদবাহ্যাঃ স্মৃতয়ো যাশ্চ কাশ্চ কুদৃষ্টয়ঃ ।
 শ্রুতয়ো সর্বাস্তা নিষ্ফলাঃ প্রেত্য তমোনিষ্ঠা হি তাঃ স্মৃতাঃ" ॥ -১২/৯৫📖🌼

অর্থাৎ, বেদবাহ্য অর্থাৎ বেদবিরুদ্ধ যে সব স্মৃতি আছে এবং যে সব শাস্ত্র কুদৃষ্টিমূলক
অর্থাৎ অসৎ-তর্কযুক্ত মতবাদমসূহ যে শাস্ত্রে আছে, সেগুলি সব শেষ পর্যন্ত একেবারে নিষ্ফল অর্থাৎ বৃথা বা অকিঞ্চিৎকর ব’লে প্রতিভাত হয় এবং সেগুলি তমোনিষ্ঠ ব’লে স্মৃত হয়ে থাকে৷৷ ৯৫ ৷৷

অপর শ্লোকে, মহর্ষি মনু বলেছেন, 

"উৎপদ্যন্তে চ্যবন্তে চ যান্যতোঽন্যানি কানি চিৎ।
 উৎপদ্যন্তে বিনশ্যন্তি তান্যর্বাক্কালিকতয়া নিষ্ফলান্যনৃতানি চ" ॥ - ১২/৯৬📖🌼 

অর্থাৎ, এই বেদ ছাড়া আর যত কিছু শাস্ত্র আছে অর্থাৎ যেগুলি পুরুষ-কল্পিত সেগুলি কালক্রমে উৎপন্ন হয় এবং বিনাশও প্রাপ্ত হয়। সেগুলি সব অর্বাচীনকালীন; এজন্য সেগুলি সব নিষ্ফল ও মিথ্যা।

তাহলে আমরা উপরিউক্ত বিশ্লেষণ থেকে এটা স্পষ্ট উপলব্ধি করি আমাদের নিকট বেদই মূখ্য। যদি কোনো শাস্ত্রের কথা বেদবিরোধী হয় তাহলে তা অগ্রহণযোগ্য। বেদ এর এরুপ মান্যতার পিছনে রয়েছে বেদের ঐশ্বরিক প্রামাণ্যতা। 

"তস্মাদ্যজ্ঞাতসর্বহুত‌ ঋচঃ সামানি জজ্ঞিরে‌ ।
ছন্দাঁসি জজ্ঞিরে‌ তস্মাদ্যজুস্তস্মাদজায়ত ।।
- যজু: ৩১/৭📖🌼 

অর্থাৎ, সেই সর্বপূজ্য‌, সর্বোপাস্য‌, পূর্ণ‌ ব্রহ্ম পরমেশ্বর‌ হতে‌ ঋগ্বেদ‌, যজুর্বেদ‌, সামবেদ‌ এবং অথর্ববেদ উৎপন্ন হয়েছে‌ ; অর্থাৎ,  সেই পরমেশ্বর‌ই বেদের‌ প্রকাশ‌ করেছেন । 

সেহেতু একমাত্র পবিত্র বেদ ঐশ্বরিক বিধান যা সকল শাস্ত্রের মীমাংসার ভিত্তিমূল।

তাই হে অমৃতের সন্তানগণ! আসুন পবিত্র বেদ অধ্যয়ন করি। এবং পবিত্র বেদ এর আদর্শ সকল কুসংস্কার দূর করে সত্যকে প্রচার করি। 

প্রচারে:VEDA

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ