যোগ ও মুক্তি।


"যোগ ও মুক্তি"

"যোগ"

যোগদর্শন ভারতীয় দর্শনের মধ্যে অন্যতম প্রসিদ্ধ এবং জগৎ খ্যাত। যোগব্যায়াম বর্তমান সময়ে এসে প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্য, এশিয়া থেকে ইউরোপ সমগ্র বিশ্বে এক আলোড়ন সৃষ্টিকারী বিষয়। প্রতিবছর ২১ জুন "বিশ্ব যোগ দিবস" হিসেবে পালিত হয়ে থাকে। বিশ্বের ১৮০টি দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে "যোগ দিবস" পালন করা হয়। সুস্থ, নিরোগ এবং জীবন ও মনের উৎকর্ষ সাধনে যোগ এর প্রসার রীতিমতো আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তবে যোগ শুধু ব্যায়াম বিশেষে সীমাবদ্ধ কোনো তত্ত্ব বিশেষ নয় বরং প্রাচীন ভারতীয় ঋষিদের প্রদত্ত মোক্ষ অর্জনকারী মার্গ হলো যোগ। 

সেজন্য শ্রীমদ্ভগবদগীতায় যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন,  

"তপস্বিভ্যোহধিকোযোগী জ্ঞানিভ্যোহপিমতোহধিকঃ।
কর্ম্মিভ্যশ্চা ধিকাযোগী তস্মাদযোগী ভবার্জ্জুন।।"
- শ্রীমদ্ভগবদগীতা ৬/৪৬

অর্থাৎ, যোগীগণ তপস্বী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ, জ্ঞানীগণ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ, কর্মিগণ অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ, ইহাই আমার মত। অতএব যে অর্জুন তুমি যোগী হও।

➡️ যোগ কি এবং যোগের উদ্দেশ্য বা পরিণতি কি? 

মহর্ষি পতঞ্জলি যোগসূত্রের প্রথমে যোগের ব্যাখ্যায় বলেছেন, 

"য়োগশ্চিত্তবৃত্তিনিরোধ। 
তদাদ্রষ্টু্ স্বরুপেহবস্থানম্।।"
- যোগসূত্র : সমাধিপাদ ১/২-৩

অর্থাৎ, চিত্তের বৃত্তি নিরোধ করাই যোগ। চিত্তবৃত্তি নিরোধ হওয়ার পর যোগী পরমাত্মার স্বরুপে স্থিতি লাভ করে। 

➡️ কে যোগ করতে পারেন? 

শ্রীমদ্ভগবদগীতায় এ বিষয়ে বলা হয়েছে, 

"যুক্তাহারবিহারস্য যুক্তচেষ্টস্য কর্মসু৷
যুক্তস্বপ্নাববোধস্য যোগো ভবতি দুঃখহা৷।"
- শ্রীমদ্ভগবদগীতা ৬/১৭

অর্থাৎ, যিনি পরিমিত আহার বিহার করেন, পরিমিত প্রয়াস করেন, যার নিদ্রা জাগরণ নিয়মিত তিনিই যোগ অভ্যাসের দ্বারা সমস্ত জড়জাগতিক দুঃখের নিবৃত্তি সাধন করতে পারেন।

শ্রীমদ্ভগবদগীতাকে বলা হয় যোগশাস্ত্র। কারণ এর ১৮টি অধ্যায়ই বিভিন্ন যোগের উপর ভিত্তি করে রয়েছে। 

📜 যোগের লক্ষ্য পরমাত্মার সান্নিধ্যে বা তাহার স্বরুপে স্থিতি লাভ। যোগের সেই অন্তিম অবস্থাকে বলা হয় সমাধি। সমাধি লাভ এর জন্য পরমাত্মার সর্বশ্রেষ্ঠ নাম ও৩ম্ উচ্চারণ দ্বারা তাহার ধ্যান করার উল্লেখ রয়েছে যোগসূত্রে। 

"ঈশ্বরপ্রণিধানাদ্বা।
ক্লেশকর্মবিপাকাশয়ৈরপরামৃষ্টঃ পুরুষবিশেষ ঈশ্বরঃ।
তত্র নিরতিশয়ং সর্বজ্ঞবীজম্।
স পূর্বেষামপি গুরুঃ কালেন অনবচ্ছেদাৎ।
তস্য বাচকঃ প্রণবঃ। 
তজ্জপস্তদর্থভাবনম্।
-যোগসূত্র : সমাধিপাদ,২৩-২৮

অর্থাৎ, ঈশ্বরের প্রতি প্রণিধান বা একনিষ্ঠতার দ্বারা সমাধিলাভ হয়। দুঃখ, কর্ম, কর্মফল বা বাসনা যাঁকে স্পর্শ করতে পারে না, তিনিই ঈশ্বর। ঈশ্বরই নিরতিশয়ত্ব প্রাপ্ত সর্বজ্ঞবীজ। তিনি কালের দ্বারা অবিচ্ছিন্ন পূর্ব পূর্ববর্তী অনাদিকাল থেকেই গুরু। প্রণব বা ॐ কারই তার বাচক। ॐ কারের সদা জপ এবং ধ্যানে সমাধিলাভ হয়।

➡️ যোগ অভ্যাসের প্রক্রিয়া সম্পর্কে শ্রীমদ্ভগবদগীতায়
বলা হয়েছে, 

"সমং কায়শিরোগ্রীবং ধারয়ন্নচলং স্থিরঃ৷
সংপ্রেক্ষ্য নাসিকাগ্রং স্বং দিশশ্চানবলোকয়ন্৷৷
প্রশান্তাত্মা বিগতভীর্ব্রহ্মচারিব্রতে স্থিতঃ৷
মনঃ সংযম্য মচ্চিত্তো যুক্ত আসীত মত্পরঃ৷৷"
- শ্রীমদ্ভগবদগীতা ৬/১৩-১৪

অর্থাৎ, শরীর, মস্তক, গ্রীবাকে সরল রেখে অন্যদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপিত না করে নাসিকার অগ্রভাগে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে আমার(পরমাত্মার) ধ্যানপূর্বক যোগ অভ্যাস করবে। 

📜 যোগদর্শনের মধ্যে যোগীর সাধন প্রসঙ্গে যোগের এ আটটি অঙ্গের উল্লেখ রয়েছে। যা সংক্ষেপে অষ্টাঙ্গ হিসেবে সুপরিচিত। এই অষ্টাঙ্গ পর্যায়ক্রমে অনুসরণ করে যোগী পরমাত্মার স্বরূপে স্থিতি লাভ করতে সমর্থ হয়।

➡️ অষ্টাঙ্গসমূহ: 

"যম-নিয়মাসন-প্রাণায়াম-প্রত্যাহার-ধারণা-ধ্যানসমাধয়োঽষ্টাবঙ্গানি"।। - যোগসূত্র: সাধনপাদ-২৯
‌অর্থাৎ, যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান ও সমাধি-এই আটটি যোগের অঙ্গসরূপ।
➡️ যম: 

"‌অহিংসা সত্যাস্তেয়-ব্রহ্মচর্যাপরিগ্রহা যমাঃ"।
- যোগসূত্র: সাধনপাদ- ৩০
‌অর্থাৎ, অহিংসা, সত্য, অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য ও অপরিগ্রহ-এইগুলিকে যম বলে।
➡️ নিয়ম: 

"‌শৌচ-সন্তোষ-তপঃ-স্বাধ্যায়েশ্বরপ্রণিধানানি নিয়মাঃ"।
‌- যোগসূত্র: সাধনপাদ - ৩২
‌অর্থাৎ, শৌচ, সন্তোষ, তপ, স্বাধ্যায় ও ঈশ্বর-প্রণিধান-এইগুলি নিয়ম।
➡️ আসন: 

"‌স্থিরসুখমাসনম্"। - যোগসূত্র:সাধনপাদ - ৪৬
‌অর্থাৎ, যে অবস্থায় অনেকক্ষণ স্থিরভাবে ও সুখে বসা যায়, তাহার নাম আসন।
➡️ প্রাণায়াম: 

"‌তস্মিন্ সতি শ্বাসপ্রশ্বাসয়োর্গতিবিচ্ছেদঃ প্রাণায়ামঃ"।
‌- যোগসূত্র: সাধনপাদ - ৪৯
‌"অর্থাৎ, আসন জয়ের পর শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি সংযম করাকে প্রাণয়াম বলে।"
➡️ প্রত্যাহার:

"‌স্বস্ববিষয়াসম্প্রয়োগে চিত্ত-স্বরূপানুকার ইবেন্দ্রিয়াণাং প্রত্যাহারঃ"। - যোগসূত্র: সাধনপাদ - ৫৪
‌"অর্থাৎ, ইন্দ্রিয়গুলি যখন নিজ নিজ বিষয় ত্যাগ করিয়া চিত্তের স্বরূপ গ্রহণ করে তখন তাহাকে প্রত্যাহার বলে।"
➡️ ধারণা: 

‌দেশবন্ধশ্চিত্তস্য ধারণা। -যোগসূত্র: বিভূতিপাদ-১
‌অর্থাৎ, চিত্তকে কোন বিশেষ বস্তুতে সংলগ্ন রাখাকে ধারণা বলে।
➡️ ধ্যান: 

"‌তত্র প্রত্যয়ৈকতানতা ধ্যানম্"।-যোগসূত্র: বিভূতিপাদ-২

‌অর্থাৎ, সেই বস্তুবিষয়ক জ্ঞান সর্বদা একইভাবে প্রবাহিত হইলে তাহাকে 'ধ্যান' বলে।
➡️ সমাধি:

"‌তদেবার্থমাত্রনির্ভাসং স্বরূপশূন্যমিব সমাধিঃ"।
- যোগসূত্র: বিভূতিপাদ- ৩
‌অর্থাৎ, ধ্যানের দ্বারা বাহ্য উপাধি পরিত্যাগপূর্বক কেবলমাত্র অর্থ প্রকাশিত হইলে তাহাকে "সমাধি' বলে।

হে অমৃতের সন্তানগণ! যোগ শব্দের অর্থ পরমাত্মার স্বরুপে স্থিত হওয়া। যোগীর একমাত্র লক্ষ্য পরমাত্মার সান্নিধ্যে লাভ তথা মুক্তি। তাই প্রতিদিন যোগাভ্যাস করি এবং জীবনকে মোক্ষ অর্জনের পথে এগিয়ে নিয়ে যাই।

প্রচারে: VEDA

Please Select Embedded Mode To Show The Comment System.*

নবীনতর পূর্বতন