"বঙ্গের শিবাজি মহারাজ প্রতাপাদিত্য"



"বঙ্গের শিবাজি মহারাজ প্রতাপাদিত্য"

মোঘল আধিপত্যের বিরুদ্ধে গর্জে উঠার সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এর ইতিহাস অধ্যয়নের চেষ্টা করলে সর্বাগ্রে যে সুমহান বীরের নাম আসে, তিনি হিন্দু হৃদয় সম্রাট ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ ও তাহার মারাঠি সাম্রাজ্য। অকুতোভয় সংগ্রাম, দুঃসাহসিক অভিযান, সমরকৌশল এর অপূর্ব শ্রেষ্ঠত্বের সুনিপুণ দূর্গের নাম ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ। সে হিন্দু জাগরণ ও স্বরাজ এর চেতনার জন্য মারাঠি সাম্রাজ্য সর্বদা সম্মানের সুউচ্চ আসনে আসীন থাকবে। 

তবে আমাদের বঙ্গে তেমনি এক বীরের উত্থান ঘটেছিলো মোঘল সম্রাট আকবরের শাসনাধীন সময়ে। ইতিহাসবিদেরা সে অকুতোভয় বীরকে বঙ্গের শিবাজি বলে সম্বোধন করে থাকে। তবে সে বীর ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ এর আবির্ভাব এর পূর্বে মোঘল আধিপত্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি যশোহরের রাজা 'মহারাজ প্রতাপাদিত্য"

মহারাজা প্রতাপাদিত্য গুহরায় ১৫৬১ থেকে –১৬১১ খ্রি পর্যন্ত বঙ্গদেশের যশোহর সাম্রাজ্যের নৃপতি, মুঘল শাসনাধীন ভারতে স্বাধীন "স্বরাজ" এর আদর্শ স্থাপন করতে চাওয়া দুঃসাহসপ বাঙ্গালী সম্রাট। ষোড়শ শতকের সূচনায় যখন সমগ্র ভারতবর্ষ জুড়ে মুঘল সাম্রাজ্য বিস্তার হতে থাকে, সেই অমানিশার ক্রান্তিলগ্নে পূর্ব ভারতে স্বতন্ত্র সনাতনী শাসনের আলোকবর্তিকা প্রজ্জ্বলিত রেখেছিল বঙ্গের ৮ টি স্বাধীন হিন্দুরাজ্য। এই রাজ্যসমূহের মধ্যে যশোহর রাজ্যের অগ্নিকুলগৌরব রায়শ্রেষ্ঠ মহারাজাধিরাজ প্রতাপাদিত্যের নেতৃত্বে এক সনাতনী সাম্রাজ্য উত্থান হতে থাকে। মুঘল সাম্রাজ্যের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হয়ে সমগ্র বৃহৎবঙ্গে শাসন বিস্তার করে তিনি নির্মাণ করেন অখণ্ড সনাতনী যশোর সাম্রাজ্য । তাঁর অখণ্ড যশোর সাম্রাজ্য কেন্দ্রে ধূমঘাট থেকে শুরু করে পশ্চিমে বিহারের পাটনা, দক্ষিণে উড়িষ্যার পুরী ও পূর্বে চট্টগ্রামের কাছে সন্দ্বীপ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। প্রতাপাদিত্য তার পিতার মৃত্যুর পরে যশোরের সকল সম্পদের একমাত্র উত্তরসূরী হয়েছিলেন। 

মহারাজ প্রতাপাদিত্যের পিতা বিক্রমাদিত্য শ্রীহরি ছিলেন বাংলার আফগান শাসক দাউদ খান কররানির অধীনে একজন প্রভাবশালী রাজ কর্মচারী। দাউদ কররানী প্রধানমন্ত্রী লোদী খানকে হত্যা করেন এবং রাজক্ষমতাবলে তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেন। পরবর্তীতে দাউদ খান কররানী তাকে ‘বিক্রমাদিত্য’ উপাধি প্রদান করেন এবং মৃত জমিদার চাঁদ খানের জমিদারি তাকে দান করেন। উল্লেখ্য যে, চাঁদ খানের কোন বংশধর ছিল না।দাউদ খানের পতনের পর শ্রীহরি বিপুল সংখ্যক সরকারি সম্পদের মালিক বনে যান । শ্রী হরি ১৫৭৪ সালে বাওর এলাকায় যান এবং সেখানে নিজেকে মহারাজা বিক্রমাদিত্য হিসেবে ঘোষণা করেন। ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে অতি অল্প বয়সে শ্রীহরি বিক্রমাদিত্যর ঔরসে বসু কন্যার গর্ভে একটি সন্তানের জন্ম হয়। তার নাম রাখা হয় প্রতাপ গোপীনাথ। এই প্রতাপই বিশ্ববিশ্রুত বঙ্গেশ্বর মহারাজা প্রতাপাদিত্য। যুবরাজ অবস্থায় তিনি প্রতাপাদিত্য নামে পরিচিত হয়েছিল।

সেই প্রতাপাদিত্যই পরবর্তী সময়ে মোঘল আধিপত্যের বিরুদ্ধে গর্জে উঠে নির্মাণ করেন স্বতন্ত্র সনাতনী সাম্রাজ্য। মোগলদের বিরুদ্ধে তিনি বারংবার যুদ্ধে অবতীর্ণ হন, নিজের সামরিক কুশলতাসম্পন্ন গুণের জন্য প্রতিবার মোঘল সেনাদের পরাস্ত করেন। হিজলির যুদ্ধ ও উড়িষ্যা বিজয়, সাতগাহের যুদ্ধ, রায়গড় এর যুদ্ধ, রাজমহলের যুদ্ধ
,পাটনার যুদ্ধ ও যশোর সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা,কালিন্দীর যুদ্ধ, সলকার যুদ্ধ
,খাগারঘাটের যুদ্ধ সহ বহু যুদ্ধে তিনি বীরদর্পে অবতীর্ণ হন এবং বিজয় অর্জন করেন এবং প্রতিষ্ঠা করেন স্বাধীন সনাতনী সাম্রাজ্য। 
 
খাগড়াঘাট যুদ্ধের পর মুঘলরা এক সন্ধি প্রস্তাব করে। মুঘলরা এই বিপুল যুদ্ধে জয়লাভ করলেও উভয় পক্ষের সেনারা ক্লান্ত এবং অবসন্ন ছিল। চুক্তিতে প্রতাপাদিত্যের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়।প্রতাপাদিত্য গিয়াস খানের নিকট পরাজিত হবার পর তাকে শৃঙ্খলিত করে গিয়াস খান নিজে ইসলাম খানের দরবারে হাজির করেন। ঢাকায় তাকে আটক করে রাখা হয়।প্রতাপাদিত্যের জীবনের শেষ দিনগুলি সম্পর্কে খুব ভালো কোনো প্রামাণ্য দলিল পাওয়া যায়নি। কিছু মুঘল দলিলে পাওয়া যায় যে তাকে বন্দি অবস্থায় দিল্লি নেয়ার পথে তিনি বেনারস থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে বাংলায় ফেরার পথে তিনি মারা যান। তেজস্বিতা, ধর্মনিষ্ঠা ও স্বাধীনতা স্থাপনের চেষ্টা প্রতাপকে এ অঞ্চলের লোকদের নিকটই শুধু নয়, সমগ্র ভারতবর্ষের মানুষের কাছে অমর করে রেখেছে।

গুরম্নদেব রামদাস স্বামী তাই লিখেছেন-

বলিলে যে বঙ্গদেশী প্রতাপের কথা, 
শুন গুরম্নত্ব তার। 
তেজোবীর্য্যগুণে প্রতাপ প্রস্ত্তত ছিলো স্বাধীনতা লাভে, 
কিন্তু তা’র জাতি, দেশ না ছিল প্রস্তুত;
জ্ঞাতিবন্ধু বহু তা’র ছিল প্রতিকূল, 
তাই হল ব্যর্থ চেষ্টা। 
মূঢ় সেই নর, দেশ, কাল , পাত্র মনে না করি’ বিচার, একা যে ছুটিতে চায়; 
চরণস্খলনে নাহি রহে কেহ ধরি’ উঠাইতে তারে।।

ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, নিজের আপনজনের কারণে তিনি হয়েছিলেন বন্দী, হয়েছিল পরাজয়, অধরা থেকে যায় তার স্বপ্ন। যদি তিনি সত্যি বিজয় অর্জন করতেন, তবে মারাঠি সাম্রাজ্যের মতো বঙ্গেও গড়ে উঠতো স্বতন্ত্র সনাতনী সাম্রাজ্য। যা মোঘল আধিপত্যের সমাধি রচনা করতো বহু আগে। 

আমরা  সনাতনীরা প্রেরণার উৎস হিসেবে ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ এর আদর্শকে ধারণ করলেও, বঙ্গের বীর মহারাজ প্রতাপাদিত্যর বীরত্বের ইতিহাস থেকে বিস্মৃত।

✏️ Run With Veda

#veda

Please Select Embedded Mode To Show The Comment System.*

নবীনতর পূর্বতন