"সনাতন ধর্ম নাকি দর্শন"


"সনাতন ধর্ম নাকি দর্শন"

📌 সাম্প্রতিক সময়ে একজন সুবোধ জ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তি এরুপ দাবি উত্থাপন করেছেন যে সনাতন কোনো ধর্ম নয় বরং তাহা একটি দর্শন। সে হিসেবে তিনিও একজন সনাতনী এবং পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ মাত্রই সনাতনী। আমরা ভ্রাতা অভিব্যক্তিকে সম্মান প্রদর্শন করি এবং তাহার নিজেকে সনাতনী হিসেবে দেখার যে উদার দৃষ্টিভঙ্গি সে মনোভাবকে শ্রদ্ধা জানাই। 

কিন্তু ভ্রাতা একটি অভিমতের সাথে আমরা একমত হতে না পারার জন্য আন্তরিক ভাবে দুঃখিত। তাহার দাবি "সনাতন কোনো ধর্ম নয় বরং দর্শন"। আমরা এরুপ দাবি স্পষ্ট বিরোধিতা করি এবং সে সংশয় নিবারণে কিছু আলোচনার ভিত্তিতে তথ্য প্রমাণসহ দাবিটি খণ্ডন করছি। 

প্রথমত, ধর্ম কি তা জানা আবশ্যক:

সংস্কৃত শব্দ ধৃ ধাতু হতে ধর্ম শব্দের উৎপত্তি যার অর্থ ধারণ করা। স্বয়ং ঈশ্বর যে ধর্মের প্রবর্তন করেছেন;আমরা সেই চিরন্তন ধর্মের ধারক। ধর্মের আগে কোন বিশেষ্য বা বিশেষণ এর প্রয়োজন নেই যে অমুক ধর্ম, তমুক ধর্ম। সেরূপ যেমন সত্য সত্যই, ন্যায় ন্যায়ই। এদের পূর্বে কোনো বিশেষণের প্রয়োজন নেই। তেমনি ধর্ম সত্য, তাই তাকে সত্যধর্ম বলা হয়। ধর্ম শাশ্বত চিরন্তন, তাই তাকে সনাতন ধর্ম বলা হয়। এই ধর্ম সৃষ্টির নিয়মে সুশৃঙ্খলভাবে প্রবাহিত, তাই তাকে ঋতম্ বলা হয়। যে প্রাণী বা বস্তু যে বৈশিষ্ট্য ধারণ করে সেটিই তার ধর্ম। যেমন- জলের ধর্ম তারল্য, আগুনের ধর্ম তাপ, পশুর ধর্ম পশুত্ব তেমনি মানুষের ধর্ম মনুষ্যত্ব বা মানবতা। সেজন্য একমাত্র সনাতনধর্মে বলা হয়েছে, 

"মনুর্ভব জনয়া দৈবং জনম্"
 - ঋগ্বেদ, ১০/৫৩/৬।

অর্থাৎ, প্রকৃত মানুষ হও এবং অন্যকেও মানুষ হিসেবে গড়ে তোল।

"যতোহভ্যুদয়নিঃশ্রেয়সসিদ্ধিঃ স ধর্মঃ"।।  (বৈশেষিক দর্শন– ১/১/২)

সূত্রার্থঃ- (যতঃ) যা দ্বারা (অভ্যুদয়) এই সংসারের [বিশ্বের] উন্নতি এবং (নিঃশ্রেয়স) মোক্ষ (সিদ্ধিঃ) সিদ্ধি হয় (স ধর্মঃ) তাকে ধর্ম বলা হয়। 

অর্থাৎ যা দ্বারা বিশ্বের উন্নতির সহির শান্তি এবং উত্তম আনন্দ প্রাপ্তি হয় তাহাই ধর্ম। কেহ যদি মনুষ্য শরীর প্রাপ্ত হয়েও পশুত্ব ধারণপূর্বক হিংসা, বিদ্বেষ আদি করে তাহলে সে নিজ ধর্ম হইতে বিচ্যুত হইলো এবং নরকে ধাবিত হইলো।

কি কি গুণাগুণ মনুষ্যের ধর্মের তা মনুসংহিতায় স্পষ্ট বলা হয়েছে,  

"ধৃতিঃ ক্ষমা দমোহস্তেয়ং
শৌচমিন্দ্রিয়-নিগ্রহঃ।
ধীর্বিদ্যা সত্যমক্রোধো
দশকম্ ধর্মলক্ষণম্" 
-মনুসংহিতা, ৬/৯২

অর্থাত্‍, সহিষ্ণুতা,ক্ষমা ,চুরি না করা ,শুচিতা ,ইন্দ্রিয়সংযম,শুদ্ধ বুদ্ধি,জ্ঞান,সত্য এবং ক্রোধহীনতা-এইটি দশটি ধর্মের লক্ষণ।

ধর্ম মনুষ্য তথা এই জগতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কোনো পদার্থ ধর্মহীন হতে পারে নাহ, বরং ধর্ম তাকে বৈশিষ্ট্য দান করে এবং নির্দিষ্ট পরিচয় প্রদান করে। সেজন্য, অগ্নির দগ্ধতা দেখে আমরা তাকে অগ্নি বলে সম্বোধন করি, জলের তরলতা দেখে আমরা সে পদার্থকে জল হিসেবে সনাক্ত করি, সেরুপ মনুষ্যকে তাহার মনুষ্যত্বের গুণাবলী দেখে তাহাকে মানুষ বলে থাকি কিন্তু এর বিপরীত হলে তাকে অমানুষ বলে উঠি। অর্থাৎ যে সকল গুণ তাহার মাঝে বিদ্যমান থাকলে তাকে সে পদার্থ হিসেবে সম্বোধন করে থাকি তাহার অনুপস্থিতি থাকলে তাকে আর সে পদার্থ হিসেবে গণ্য করি নাহ। যেমন জল কঠিন হলে তাকে বরফ বলে থাকি। 

কিন্তু ধর্মকে রিলিজিয়ন অর্থে গ্রহণ করা অনুচিত ও অযৌক্তিক। কারণ ধর্মের ইংরেজি পরিশব্দ কখনো রিলিজিয়ন হতে পারে নাহ। 

পৃথিবীতে আমরা যে সব প্রচলিত Religion দেখি সেগুলো ধর্ম নয়। সেগুলো নির্দিষ্ট কিছু আচার অনুষ্ঠান নিয়ম কানুনের সমষ্টিগত সাংস্কৃতিক, ভৌগলিক ও রাজনৈতিক মতাদর্শ। যা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মানুষের আদর্শের কারণে তৈরি যা বহু ক্ষেত্রে ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক পটভূমি দ্বারা প্রভাবিত।  Religion শব্দের সংস্কৃত অর্থ ধর্ম নয়, Religion শব্দের সংস্কৃত অর্থ মার্গ। ধর্ম শব্দটা Religion এর বাংলা হিসেবে আমরা প্রচলিত ভুল অর্থে বা Misnomer হিসেবে ব্যবহার করি।

➡️জল, অগ্নি, বায়ু কি কখনো আলাদা আলাদা ধর্ম থাকে? 
➡️জল, অগ্নি, বায়ুর ধর্ম কি সময়ে সময়ে পরিবর্তন হয়? 
➡️জল, অগ্নি, বায়ু কি কখনো তাদের ধর্ম পরিবর্তন করতে পারে? 

এর সদুত্তর হলো : না। এমনটা সম্ভব নয় যে, অগ্নি পূর্বে সকল কিছু দগ্ধ করতো এখন করে না। যদি এমন হয় বা অগ্নি তার দগ্ধ করার ধর্ম পরিবর্তন করে তাহলে আমরা কি তাকে কখনো অগ্নি বলতে পারবো? অবশ্যই না। তাই শাস্ত্রে বলা হয়েছে, ধর্ম মাত্রই সনাতন বা চিরন্তন। অর্থাৎ, যা ছিল আছে থাকবে। যার শুরু নেই বা বিনাশ নেই। যা পরিবর্তন করা যায় না। তাহাই সনাতন বা চিরন্তন। এজন্য, মত বা পথ পরিবর্তন করা সম্ভব, তবে ধর্ম পরিবর্তন সম্ভব নয়। মত বা পথের নাম বিশেষণ হয়, কিন্তু ধর্ম ধর্মই। সত্য যেমন সত্যই, ন্যায় যেমন ন্যায়, তেমনি ধর্মই ধর্ম তাহার আলাদা নামের প্রয়োজন নেই। বরং উপমা রয়েছে যে সনাতন। এবং সে উপমা দ্বারা পরমাত্মাকেও নিত্য সনাতন বলা হয়েছে, তেমনি ধর্মকেও সনাতন বলা হয়েছে।

দর্শন কি এবার তা নির্ধারণ হোক: 

দর্শন, ইংরেজিতে ফিলোসফি philosophy গ্রিক ভাষা φιλοσοφία, ফিলোসোফিয়া, আক্ষরিকভাবে "জ্ঞানের প্রতি অনুরাগ বা ভালোবাসা"। দর্শন বলতে অস্তিত্ব, জ্ঞান, মূল্যবোধ, কারণ, মন এবং ভাষা সম্পর্কে সাধারণ এবং মৌলিক প্রশ্নগুলোর অধ্যয়ন। অর্থাৎ, জগৎ, জীবন, মানুষের সমাজ, তার চেতনা এবং জ্ঞানের প্রক্রিয়া প্রভৃতি মৌল বিধানের আলোচনাকেও দর্শন বলা হয়।

সেক্ষেত্রে দর্শন শব্দ দ্বারা ধর্মের মতো পদার্থ বা প্রাণী গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্যকে নির্দেশ করে নাহ। বরং, সে সকল বৈশিষ্ট্য বা গুণকে জানার যে পথ তাহাকে দর্শন হিসেবে অভিহিত করা হয়ে থাকে। সেজন্য, সনাতনধর্ম সম্পর্কে আরো গভীর জানার জন্য সময়ে সময়ে বিবিধ দর্শন সৃষ্টি হয়েছে যা ষড়দর্শন হিসেবে সুপরিচিত। 

ধর্ম ও দর্শনের মধ্যে তুলনামূলক পার্থক্য ও বিশ্লেষণ: 

ধর্ম বলতে এ জগতের প্রতিটি বস্তু বা পদার্থের গুণাবলী অর্থে নির্দেশ করে। কিন্তু বিপরীতে দর্শন হলো এ মহাজগৎ এ যে ধর্ম বিদ্যমান তাহাকে আরো গভীর ভাবে জানার প্রয়াস করা। দর্শনের প্রণেতা হয়ে থাকে যেমন বৌদ্ধ দর্শনের প্রণেতা গৌতম বুদ্ধ, সাংখ্য দর্শনের প্রণেতা মহর্ষি কপিল কিংবা পাশ্চাত্যের বিবিধ দর্শনের প্রণেতাগণ। কিন্তু ধর্মের রচয়িতা একমাত্র ঈশ্বর। কারণ আপনি আমি চাইলেও কোনো বস্তুর ধর্ম সৃষ্টি করতে পারি নাহ। 

উপরোক্ত ধারণা বিশ্লেষণ করে উপলব্ধি হয়, মনুষ্য মাত্রই তাহার ধর্ম এক, পদার্থ মাত্রই তাহার ধর্ম এক। একাধিক ধর্মের ধারণা সনাতন ধর্ম শাস্ত্রে গৃহীত নয়। কিন্তু ধর্ম এক হলেও সত্যকে জানার চেষ্টায় মনিষীগণ যে চিন্তা, ধারণা প্রদান করেছিলেন তাহার থেকে যাত্রা শুরু করে বিবিধ দর্শন। সে দর্শন এর অনুসরণ করে বহুবিধ অনুসারী। যারা সেই দর্শনকে করেছে সমৃদ্ধ ও অগ্রসরমান। যাহার থেকে সৃষ্টি হয়েছে বহুবিধ মার্গ বা সম্প্রদায়ের।

তবে আমরা ভ্রাতার সাথে একমত যে প্রতিটি প্রাণী মাত্রই সনাতন এর অংশ। সেজন্য, আমরা সমস্বরে বলে থাকে ধর্মই সনাতন, সনাতনই ধর্ম। 

বিঃদ্রঃ আমরা পরমতসহিষ্ণুতায় বিশ্বাসী। কারণ প্রত্যেক মানুষ তার নিজের ভাবাদর্শকে লালন করে। সে সকল ভাবাদর্শকে আমরা সম্মান প্রদর্শন করি।

✏️Run With Veda 

#Veda

Please Select Embedded Mode To Show The Comment System.*

নবীনতর পূর্বতন