"গোলাহাট গণহত্যা"
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস ত্যাগ ও বীরত্বের ইতিহাস। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতার শিকার হয়েও মাথা নত না করার ইতিহাস। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সমগ্র মানচিত্র জুড়ে চালিয়েছে বর্বর হত্যাকাণ্ড, খুন ধর্ষণ, লুটপাট। সে বর্বরতার ইতিহাসে জুড়ে আছে গোলাহাট গণহত্যা।
বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের ১৩ জুন তারিখে সংগঠিত হয় একটি নৃশংস হত্যাযজ্ঞ। পাকিস্তানি বাহিনী এই হত্যাকান্ডের নাম দেয় "অপারেশন খরচখাতা"। সেদিন আনুমানিক ৪৪৭ জন হিন্দু মারোয়াড়ি আবালবৃদ্ধবণিতাকে নির্বিচারে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের সহযোগী অবাঙ্গালী বিহারী ও বাঙ্গালি রাজাকার, আলবদর, আল শামস বাহিনী সম্মিলিতভাবে হত্যা করে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সকলে স্বাধীনতার পক্ষে ছিলো না। কেউ কেউ মাতৃভূমির স্বাধীনতা সংগ্রামকে ধূলিসাৎ করতে হানাদারদের দোসরে পরিনত হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে উর্দুভাষী অবাঙালি বিহারিরা সরাসরি পাকিস্তানী হানাদারদের নৃশংসতায় সাহায্য করে। ফলস্বরূপ, সৈয়দপুরে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি বড় সমর্থক গোষ্ঠী তৈরি হয়। ১৯৭১-এর ১২ এপ্রিলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাহিনী পরিকল্পিতভাবে রংপুর সেনানিবাসের অদূরে বিখ্যাত তুলসিরাম আগারওয়াল, যমুনাপ্রসাদ কেরিয়া, রামেশ্বরলাল আগারওয়ালকে হত্যা করে। এ হত্যাকাণ্ড মাড়োয়ারি সম্প্রদায়ের মাঝে তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি করে। উর্দুভাষী বিহারীরা মাড়োয়ারিদের বাড়িঘর, দোকান, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান লুটপাট শুরু করে।
১৯৭১ সালের ১৩ জুন, সকাল ১০টা। সৈয়দপুর রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ছিল একটি ট্রেন। কিছুদিন ধরে সৈয়দপুর শহরে, পাকিস্তানি সেনাদের পক্ষ থেকে মাইকে বলা হচ্ছিল, শহরে যেসব হিন্দু মাড়োয়ারি আটকা পড়ে আছেন, তাঁদের নিরাপদে ভারতে পৌঁছে দেওয়া হবে। এ জন্য একটা বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ট্রেনটি সৈয়দপুর রেলস্টেশন থেকে ভারতের শিলিগুড়ির উদ্দেশে ছেড়ে যাবে।
৪৬ বছর পর শ্যামলাল আগরওয়ালার বর্ণনা মতে, মাইকে ঘোষণা শুনে যুদ্ধে লুটতরাজের হাত থেকে তখনও যা কিছু সম্বল বেঁচে গিয়েছিল, তা-ই গোছাতে শুরু করে দেন মাড়োয়ারিরা। ১৩ জুন সকালে তাঁরা সমবেত হতে থাকেন সৈয়দপুর রেলস্টেশনে। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো বিশেষ ট্রেনে, গাদাগাদি করে সবাই ট্রেনে উঠেন।
হত্যাযজ্ঞের এক প্রত্যক্ষদর্শী তপন কুমার দাস বলেন , সকাল ১০টার দিকে স্টেশন থেকে ছেড়ে যায় ট্রেনটি। চলছিল ধীরে ধীরে। শহর থেকে বেরিয়ে রেলওয়ে কারখানা পেরিয়েই হঠাৎ থেমে যায় ট্রেন। জায়গাটা স্টেশন থেকে দুই মাইল দূরে। নাম গোলাহাট। ট্রেন থামার কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করেন তপন। বাইরে সারি সারি পাকিস্তানি হানাদার সেনা। সঙ্গে তাঁদের দোসর বিহারিরা। সেনা সদস্যদের হাতে রাইফেল। আর বিহারিদের হাতে ধারালো দেশীয় রামদা।
প্রত্যক্ষদর্শী গোবিন্দ চন্দ্র দাসের উল্লেখ করেন, "থেমে থাকা ট্রেনের কম্পার্টমেন্টে ঢুকেই পাকিস্তানি সেনারা চিৎকার করে উর্দুতে বলতে থাকেন, একজন একজন করে নেমে আসো। তোমাদের মারতে এসেছি আমরা। তবে পাকিস্তানের দামি গুলি খরচ করা হবে না। সকলকে এ কোপে বলি দেওয়া হবে।’ সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে যায় বেপরোয়া হত্যাযজ্ঞ। ধারালো রামদা দিয়ে কেটে ফেলা গলা। ওই হত্যাযজ্ঞে শিশু, বৃদ্ধ, নারীরাও রেহাই পাননি। বিভিন্ন সূত্রে বলা হয়, ওই ট্রেন হত্যাযজ্ঞে ৪৪৮ জনকে একে একে রামদা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়"।
স্বাধীনতা সূর্য ঠিকই উদয় হয়েছিল। কিন্তু হতভাগ্য মানুষদের কপালে সে স্বাধীনতার সূর্য উদয় দেখার সৌভাগ্য হয়নি। স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক অনবদ্য দলিল এই "গোলাহাট গণহত্যা"। এত নৃশংসতা, বর্বরতার পরেও কেউ যখন পাকিস্তান ও দোসরদের পাশবিকতার পক্ষে সাফাই গেয়ে উঠে তখন তাদের বিবেকের প্রতি প্রশ্ন থেকে যায়।
"পাকিস্তানি বাহিনী ও হিন্দু নিধন :- ০২
✏️ Run with veda
#veda