"শ্রীমদ্ভগবদগীতা ও উত্তম সিদ্ধান্ত" - ১

"অনিয়ন্ত্রিত ক্রোধই বিনাশের কারণ" 

মনুষ্য জীবনে বিনাশকারী কোনো বস্তু বা বিষয় যদি বিদ্যমান থেকে থাকে তবে তা নিশ্চিত রুপে ক্রোধ বা 
Anger issue। মনুষ্য ক্রোধান্বিত হয়ে তাহার বিচারকারী যে বিবেক তা থেকে বিস্মৃত হয়ে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ, ক্রোধের বশবর্তী হয়ে ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কখনো কখনো সে ভুল সিদ্ধান্ত আমাদের জীবনে ধংসাত্মক প্রভাব বয়ে নিয়ে আসে। 

ক্রোধের বিরূপ প্রভাব সম্পর্কে যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শ্রীমদ্ভগবদগীতায় উল্লেখ করেছেন,

"ক্রোধাদ্ভবতি সম্মোহঃ সম্মোহাৎ স্মৃতিবিভ্রমঃ। স্মৃতিভ্রংশাদ বুদ্ধিনাশো বুদ্ধিনাশাৎ প্রণশ্যতি॥"
- গীতা২/৬৩

সরলার্থ: ক্রোধ থেকে মোহ হয়, মোহ থেকে স্মৃতিবিভ্রম, আর স্মৃতিনাশ থেকে বুদ্ধিনাশ এবং বুদ্ধিনাশ থেকে বিনাশ প্রাপ্ত হয়।

আমাদের অনিয়ন্ত্রিত ইন্দ্রিয় বৃত্তির জন্যই ক্রোধের উৎপত্তি ঘটে। আমাদের ইন্দ্রিয় বা মনকে সন্তুষ্ট করতে পারে এরুপ কোনো কাজের ব্যাঘাত ঘটলে ক্রোধ জন্মে। 

শ্রীমদ্ভগবদগীতা ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সেরূপ কিছুই বলেছেন, 

"ধ্যায়তো বিষয়ান্ পুংসঃ সঙ্গস্তেষুপজায়তে।
 সঙ্গাৎ সংজায়তে কামঃ কামাৎ ক্রোধোহভিজায়তে" ॥ - গীতা২/৬২ 

সরলার্থ: ইন্দ্রিয়ের বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তা করতে করতে পুরুষের ঐ সকল বিষয়ে আসক্তি উৎপন্ন হয়। আসক্তি থেকে কামনা উৎপন্ন হয়, কামনা থেকে ক্রোধ উৎপন্ন হয়। 

ক্রোধের ফলে মানুষ অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হয়ে বিদ্বেষ সৃষ্টি করে। সে বিস্মৃত হয় সকলের হৃদয়ে পরমাত্মার নিবাশ। অহংকারের বশেই সে নিজের বল, কাম দ্বারা অপরকে কটুবাক্য প্রয়োগ করে। 

"অহঙ্কারং বলং দর্পং কামং ক্রোধং চ সংশ্রিতাঃ। 
মামাত্মপরদেহেষু প্রদ্বিষন্তোহভ্যসূয়কাঃ ॥"
 - গীতা ২/১৮ 

সরলার্থ : অহংকার, বল, গর্ব, কাম ও ক্রোধকে আশ্রয় করে অন্যের নিন্দাকারী মূঢ়গণ নিজের ও অপরের শরীরে স্থিত আমাকে দ্বেষ করে। 

ক্রোধ আমাদের সর্বদা ত্যাগ করা উচিত। কারণ ক্রোধ কোনো সঠিক সিদ্ধান্ত এনে দিতে পারে নাহ। ক্রোধ সে অনিয়ন্ত্রিত দাবানল এর মতো যে সবকিছু গ্রাস করে ধ্বংস করে কিন্তু যখন সে দাবানল স্বরুপ ক্রোধ শান্ত হয়, তখন সবকিছুই ছাই হয়ে যায়। 

"দন্তো দর্পোভিমানশ্চ ক্রোধ-পারুষ্টয়মেক্স চ। 
অজ্ঞানঞ চাভিজাতস্হয় পার্থ্য সম্পদমাসুরীম্ ॥ 
- গীতা ১৬/১৮ 

সরলার্থ: হে পার্থ (অর্জুন)। দন্ত ও দর্প, অভিমান ও ক্রোধ, নিষ্ঠুরতা এবং অজ্ঞান-এসকল অসৎগুণ অবশ্যই আসুরী সম্পদের অভিমুখে জাত ব্যক্তির হয়ে থাকে।

জীবনে ক্রোধ অপেক্ষা বৃহৎ শত্রু নেই। ক্রোধই আমাদের ধ্বংসের দিকে চালিত করে এবং পাপে প্রবৃত্ত করে। 

"কাম এষ ক্রোধ এষ রজোগুণসমুদ্ভবঃ। 
মহাশনো মহাপাপ্পা বিদ্ধ্যেনমিহ বৈরিণম্ ॥" 
- গীতা ৩/৩৭

সরলার্থ : শ্রীভগবান্ বললেন- রজোগুণ থেকে উৎপন্ন এই কাম ও এই ক্রোধ মহাশন এবং অত্যন্ত পাপী। এই জগতে একে শত্রু বলে জানবে। 

আমাদের ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হলে তবে আমরা এই লৌকিক জীবনে যেমন উত্তম সিদ্ধান্ত ও জীবন লাভ করবো তেমনি জীবনের অন্তিম ও পরম লক্ষ্যে সফল হতে পারবো। 

"ত্রিবিধং নরকস্যেদং দ্বারং নাশনমাত্মনঃ। 
কামঃ ক্রোধস্তথা লোভস্তস্মাদেতৎ ত্রয়ং ত্যজেৎ ॥  
এতৈর্বিমুক্তঃ কৌন্তেয় তমোদ্বারৈস্ত্রিভির্নরঃ। 
আচরত্যাত্মনঃ শ্রেয়স্ততো যাতি পরাং গতিম্ ॥"
- গীতা ১৬/২১-২২ 

সরলার্থ : হে কৌন্তেয় (অর্জুন)। কাম, ক্রোধ ও লোভ-এই তিন প্রকার নরকের দ্বার এবং আত্মার নাশক, সেজন্য এই তিনটিকে ত্যাগ করবে। এই তিন প্রকার তামসিক দ্বার (অর্থাৎ কাম, ক্রোধ ও লোভ) থেকে মুক্ত মানুষ নিজের কল্যাণসাধন করে, তারপর পরমগতি লাভ করে।

"কামক্রোধবিযুক্তানাং যতীনাং যতচেতসাম্। 
অভিতো ব্রহ্মনির্বাণং বর্ততে বিদিতাত্মনাম্ ॥" 
- গীতা ১৬/২৬ 

সরলার্থ : কাম-ক্রোধ থেকে মুক্ত, সংযতচিত্ত, পরমাত্মাদর্শী জ্ঞানী মানুষ সকল দিকেই ব্রহ্মনির্বাণে স্থিত আছেন। 

তাই হে অমৃতের সন্তানগণ! ক্রোধ সেই অগ্নিস্বরূপা, যা অনিয়ন্ত্রিত হলে সর্বৈব বিনাশকারী হয়ে থাকে। সেজন্য, আমাদের জীবনকে উত্তম হিসেবে গড়ে তুলতে ক্রোধ রুপ নরকের দ্বার পরিত্যাগ করতে হবে।

"শ্রীমদ্ভগবদগীতা ও উত্তম সিদ্ধান্ত" - ১

✏️veda --

✨Run with veda 

Please Select Embedded Mode To Show The Comment System.*

নবীনতর পূর্বতন