ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীমদ্ভগবদগীতা গণহত্যার কি অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল⁉️
সনাতন ধর্ম মনুষ্যত্ব ও জ্ঞানের পরম আশ্রয়। প্রাণী মাত্রই প্রেমের ও মিত্রতার আদর্শের ধারক সনাতন ধর্মশাস্ত্র। কারণ, বেদে মনুষ্যের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে "মিত্রস্যাহং চক্ষুষা সর্বাণি ভূতানি সমীক্ষে"
- যজুর্বেদ ৩৬/১৮ অর্থাৎ, সকল জীবকে মিত্রের চোখে দেখবে। সনাতন ধর্মশাস্ত্র কোনো ভৌগলিক কিংবা সম্প্রদায়গত সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ কোনো ধারণা নয়। সেজন্য, সনাতন শাস্ত্র অনুসারে সম্প্রদায় ভুক্তি কিংবা অপরের প্রতি দখলদারি মনোভাব জীবনের উদ্দেশ্য নয়। বরং, এই মনুষ্য জীবনকে আরো উৎকৃষ্ট করে তোলার মধ্যে রয়েছে জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য। কারণ, সনাতন শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে, "মনুর্ভব জনয়া দৈব্যং জনম্" -ঋগ্বেদ ১০/৫৩/৬ অর্থাৎ, প্রকৃত মানুষ হও এবং অন্যকেও মানুষ হিসেবে গড়ে তোল।
কিন্তু এমন উদার ও সহিষ্ণু আদর্শের ধারক সনাতন ধর্মের প্রতি কিছু কিছু অর্বাচীন মূর্খের সদৃশ বিদ্রুপাত্মক মন্তব্য করে। যা হাস্যকর ও অজ্ঞানতা সূচক হিসেবে উপলব্ধি হয়। তবে মিথ্যার খণ্ডন করে, সত্যের প্রচার আমাদের কর্তব্য। কারণ,
"ঋতং সত্যমৃতং সত্যম্" - যজুর্বেদ ১১/৪৭ অর্থাৎ, যথার্থ জ্ঞানই সত্য, সত্যই যথার্থ জ্ঞান।
সম্প্রতি রাজিবুর রহমান নামের একজন ব্যক্তি, যিনি নিজেকে কবি ও মুক্তচিন্তক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তিনি সনাতন ধর্মের আদর্শ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, অজেয় যোদ্ধা কুন্তী পুত্র অর্জুন এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখনিঃসৃত জগৎবিখ্যাত দর্শনের আকরগ্রন্থ শ্রীমদ্ভগবদগীতা সম্পর্কে বিদ্রুপাত্মক মন্তব্য করেছেন। কবি ও মুক্তচিন্তক রাজিবুর রহমান সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেন যে,
"মহাভারতে ফ্রিডরিখ নীৎসের নাম হিটলারের নাম অর্জুন। হিটলার যে দর্শনে প্রভাবিত হয়েজার্মান জাত্যভিমান প্রতিষ্ঠার জন্য গণহত্যা চালায়, তেমনি ধর্ম প্রতিষ্ঠার নামে বিভ্রান্ত অর্জুন শ্রীকৃষ্ণের কুপরামর্শে হত্যা করে নিজেরই শিক্ষক, আত্মীয়, বন্ধুদের। শ্রীকৃষ্ণের পরিবর্তে যদি অর্জুনের দীক্ষাদাতা গৌতম বুদ্ধ হতেন, তাহলে রক্তপাত ছাড়াই আরও একশত ভিন্ন উপায়ে সমস্যার সমাধান করা যেত। পৃথিবী যতদিন থাকবে, প্রতিটি গণহত্যাকারীকেই ভগবদ্গীতা গণহত্যার অনুপ্রেরণা দিয়ে যাবে, কারণ সব গণহত্যাকারীই মনে করে তারাই অর্জুনের মতো "ধর্ম” প্রতিষ্ঠা করতে চায়।"
প্রথমে নমস্কার। আপনার জ্ঞান অন্বেষণের অগ্রগতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করি এবং আপনার বিদ্রুপাত্মক মন্তব্যের জন্য নিন্দা জানাই। অজ্ঞানতা কোনো অপরাধ নয় বরং নিজের অর্জিত অসম্পূর্ণ জ্ঞান এর মাধ্যমে কোনো বিষয় সম্পর্কে সিদ্ধান্তে অবতীর্ণ হওয়া এবং বিকৃত সিদ্ধান্তকেই অন্ধের মতো মান্য করা সত্যি মূর্খতারূপ কর্মকাণ্ড। যা আপনার "মুক্তচিন্তক" পরিচয়ের সাথে সাংঘর্ষিক। তবে, আমরা আপনার এই মন্তব্যের জন্য কোনো অশুভ কামনা করি নাহ। কারণ, এমন বিরুদ্ধাচারণ সনাতন ধর্মে বৈধ। এই জগৎে সংশয় থেকে সত্য উন্মোচিত হয়, ঠিক যেমন কয়লা হতে হীরক খন্ড।
যোগেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ যুগ পুরুষ। রাষ্ট্রনীতি, সমরনীতি, কুটনীতিসহ সামগ্রিক জীবন পরিচালনার এক অনন্য ব্যক্তিত্ব ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের একাধিক দৃষ্টান্তের মধ্যে মানবজাতির জন্য রেখে যাওয়া অনবদ্য দর্শনমূলক গ্রন্থ "শ্রীমদ্ভগবদগীতা" সর্বোপরি। সুপ্রাচীন এই জ্ঞান উপনিষদের গূহ জ্ঞানকে সাবলীল রুপে মনুষ্যের নিকট উপস্থাপিত হয়। কোনো সম্প্রদায়ের জন্য, কোনো গোষ্ঠীর জন্য নয় বরং এই অনন্য জ্ঞান সকল মনুষ্যের হৃদয়ে উদয় হওয়া সংশয়, সংকট নিয়ে আলোচনা করে এবং প্রদান করে সর্বশ্রেষ্ঠ সমাধান। সেজন্য, শ্রীমদ্ভগবদগীতা বর্তমান সময়ে এসেও প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্য, রাজনৈতিক থেকে বিজ্ঞানী সকলের নিকট পরম শ্রদ্ধার এবং অনুকরণীয়। সেজন্য, মহাত্মা গান্ধী তার রচিত Gita According to Gandhi' বা 'Anasakti Yoga বইয়ে উল্লেখ করেন,
"যখন সন্দেহ আমাকে গ্রাস করে, যখন হতাশা আমার সামনে এসে দাঁড়ায় এবং দিগন্তে যখন আমি একরত্তিও আশার আলো দেখতে পাই না, তখন আমি ভগবদ্গীতার কাছে ফিরে যাই এবং সান্ত্বনা দেওয়ার মতো একটি শ্লোক খুঁজে পাই, আর তৎক্ষণাৎ আমি বিশাল দুঃখের মধ্যেও হাসতে শুরু করি।"
খুবই আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি শ্রদ্ধেয় মুক্তচিন্তক রাজিবুর আপনার নিকট যে গ্রন্থটি গণহত্যার প্ররোচক মনে হয়েছে। সে গ্রন্থটি অহিংস নীতির ধারক ও প্রচারক মহাত্মা গান্ধীর প্রিয়তম গ্রন্থ ছিল এবং তার জীবন দর্শনের বহুলাংশে শ্রীমদ্ভগবদগীতার দ্বারা প্রভাবিত ছিল। তবুও আপনার বিদ্রুপাত্মক মন্তব্যকে সম্পূর্ণভাবে ভুল প্রমাণ এর জন্য শাস্ত্রের সাহায্য নেওয়া উত্তম।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ কখনো হঠাৎ করে আসেনি বরং দীর্ঘ সময় ধরে এই প্রলয়ঙ্কারী সংঘাত তার জ্বালানি সরবরাহ করেছে। কুরুক্ষেত্রের সে যুদ্ধ বর্তমান সময়ের প্রচলিত জাতিবিদ্বেষ কিংবা জাত্যাভিমান এর কারণে সংঘটিত হয়নি। ধর্মীয় আগ্রাসী তত্ত্বও সেখানে প্রযোজ্য নয়, কারণ আপনি রিলিজিয়ন অর্থে যে ধর্মীয় আদর্শের সংঘাতকে নির্দেশ করেছেন সেটাও অমূলক। কারণ, ধর্ম প্রকৃত অর্থ রিলিজিয়ন নয় এবং বর্তমানে রিলিজিয়ন সংক্রান্ত সন্ত্রাসবাদ বা সাম্প্রদায়িকতা এর সাথে সনাতন শাস্ত্রে বর্ণিত "ধর্মযুদ্ধ" শব্দের কোনো সম্পর্ক নেই।
তবে কেন এই মহাযুদ্ধ শুরু হয়েছিলো এবং কেন এই যুদ্ধ অনিবার্য পরিণতি ছিল ⁉️
কৌরব ও পান্ডবদের মধ্যে সংঘাতের সূত্রপাত রাজ্য কিংবা সম্পদের দখল সংক্রান্ত ছিল নাহ। বরং, কৌরবদের উত্তরসূরী হওয়া সত্ত্বেও পান্ডবদের প্রতি ঘৃণা, অবহেলা ও বৈষম্যের কারণেই এই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত। ধৃতরাষ্ট্র জন্মান্ধ হওয়ায় শাসক হিসেবে অক্ষম ছিল। ফলস্বরূপ, রাজ্যের কল্যাণে শাসক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলো পাণ্ডু। তবে ধৃতরাষ্ট্র কখনো এই সিদ্ধান্তকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে পারেনি। তবে সিংহাসনের অধিষ্ঠিত হওয়ার এই দ্বন্দ্ব ইতোপূর্বে ভীষ্ম ও বিচিত্রবীর্যের ক্ষেত্রেও বিদ্যমান ছিলো। কিন্তু ভীষ্মের উদারতা ও ত্যাগী ভাব এই সমস্যার সমাধান করে।
তবে ধৃতরাষ্ট্র সে উদারচিন্তার অধিকারী ছিলেন নাহ। কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত, বনবাসে পাণ্ডুর অকালমৃত্যু হস্তিনাপুরের জন্য পুনরায় নিয়ে আসে বিপর্যয়। কুন্তী ও পান্ডু পুত্রগণ পুনরায় হস্তিনাপুর ফিরে আসে। কিন্তু হস্তিনাপুর কখনো পঞ্চপাণ্ডবের জন্য সুখকর ছিলো। একই বংশ ও পরিবারের হওয়া সত্ত্বেও পান্ডবদের পরিচয় আলাদা ভাবে গণ্য হতে থাকে। এছাড়াও, ধৃতরাষ্ট্র পুত্রদের দ্বারা শৈশব থেকেই বঞ্চনা ও লাঞ্ছনা পান্ডবদের জীবন বিতৃষ্ণা নিয়ে আসে। কিন্তু পান্ডবরা কখনো এর বিপরীতে ঘৃণা প্রদর্শন করেনি। তবে এই পান্ডবদের প্রতি এই বিদ্বেষ শুধুমাত্র কথা বা ধারণায় সীমাবদ্ধ থাকেনি বরং তা রুপ নেয় প্রাণঘাতী ষড়যন্ত্রে। শৈশবে মামা শকুনির কুবুদ্ধি অনুসারে খাদ্য রসিক ভীমকে বিষ মাখানো লাড্ডু খাইয়ে হত্যা চেষ্টা করে। কিন্তু সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এই ছোট্ট ঘটনা থেকে উপলব্ধি করা সহজ হয় ভীমের প্রতি কত বিদ্বেষ পোষণ করতেন দুর্যোধন। সময়ের আবর্তে সে বিদ্বেষ ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে। পরবর্তী সময়ে পুনরায় মাতা কুন্তীসহ পঞ্চ পাণ্ডবকে লাক্ষা গৃহে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা সে বিদ্বেষের নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। এমন উদাহরণ সমূহ থেকে শ্রদ্ধেয় মুক্তচিন্তক আপনার উপলব্ধি হওয়া উচিত কতটুকু ঘৃণা হৃদয়ে ধারণ করতো দুর্যোধন তার ভ্রাতা স্বরুপ পান্ডবদের প্রতি।
কিন্তু এমন হীন প্রচেষ্টা সত্ত্বেও পান্ডবরা ঘুরে দাঁড়ায় এবং নিজেদের ন্যায্য দাবী সিংহাসনের উত্তরসূরী হওয়া পথে চলতে থাকে। কিন্তু দুর্যোধন কখনো পান্ডবদের প্রতি সুহৃদ ছিল নাহ। দ্বন্দ্বের অবসান কল্পে, হস্তিনাপুর এর রাজ্য বিভাজন অনিবার্য হয়ে পড়ে। ঐতিহাসিক হস্তিনাপুর দুর্যোধনকে দেওয়া হয় কিন্তু দুর্গম এক স্থান দেওয়া হয় যা খাণ্ডবপ্রস্থ হিসেবে পরিচিত। তবে নিজেদের সক্ষমতা ও পরিশ্রম দ্বারা খাণ্ডবপ্রস্থ হয়ে উঠে সমৃদ্ধশালী এবং ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির চক্রবর্ত্তী সম্রাট হয়ে উঠে। অবশ্য, এই সাফল্য অর্জনে বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণের পরামর্শ সর্বোতভাবেই ছিল। কিন্তু ধুরন্ধর শকুনি ও আগ্রাসী দুর্যোধন এর তা সহ্য হয়নি৷ যুধিষ্ঠিরের অভিষেক কালে সভাকক্ষে বাক-বিতন্ডার সূত্র ধরে এক পর্যায়ে শিশুপাল নিহত হয় এবং দুর্যোধন এই সূত্র ধরে পান্ডবদের পর্যুদস্ত করার চেষ্টা করে। কিন্তু ব্যর্থ হয়ে অপমানিত হয়ে সভা ত্যাগ করে।
পরবর্তী সময়ে এই অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আয়োজিত করে ঐতিহাসিক পাশা খেলা। প্রতারণা ও কুটিলতা দ্বারা পঞ্চ পাণ্ডবকে রাজ্যহীন করা হয় এবং পরিণত হয় দাসে। কিন্তু এই বিপর্যয় শুধু রাজ্য কেড়ে নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি বরং তা ইতিহাসের ঘৃণ্যতম ঘটনার জন্ম দেয়। পঞ্চ পাণ্ডবের ধর্মপত্নী তথা যাজ্ঞসেনী দ্রৌপদীকে অতিথি থেকে দাসে পরিণত করা হয়। নিকৃষ্টের মতো তাকে টেনে হিঁচড়ে আনয়ন করা হয় এবং দ্রৌপদীর প্রতি ছুঁড়ে দেওয়া হয় মানব ইতিহাসের জঘন্য আদেশ। সভাকক্ষে সে গুরুদ্রোণ, পিতামহ ভীষ্ম, নীতির ধারক বিদুর ও হস্তিনাপুর শাসক ধৃতরাষ্ট্র স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ এর মতো জঘন্য আদেশের বিরোধিতা কেউ করেনি। এমনকি, আপনার মতো বামপন্থীদের ভিকটিম গেম এর প্রধান চরিত্র দ্রৌপদীর অপমান ও হানিকর মন্তব্য ছুঁড়ে দেয়।
📌 প্রশ্ন: কেড়ে নিয়েছে রাজ্য, পরিণত করেছে দাসে, নিজ ধর্মপত্নীকে সম্ভ্রমহানি করার কুচক্রীদের প্রতি সহানুভূতি থাকা আপনার মতো মুক্তচিন্তকদের প্রতি প্রশ্ন আপনারা নিজেকে নারীবাদী হিসেবে তুলে ধরেন কি করে? যেখানে নারীর প্রতি লাঞ্ছনা ও অন্যায় করা দুর্যোধন এর পক্ষ নিয়ে সমঝোতার কথা বলতে হয়। এটা কি দ্বিচারিতা নয়?
কিন্তু শেষপর্যন্ত এই অধর্ম কার্য সংঘটিত হওয়ার পরে পান্ডবদের রাজ্য ফিরে পাওয়ার জন্য শর্ত দেওয়া হয়। ১২ বৎসর বনবাস ও ১ বৎসর অজ্ঞাতবাস কিন্তু যদি অজ্ঞাত বাসকালে পরিচয় প্রকাশ পায় তবে পুনরায় বনবাসে যেতে হবে। এমন শর্ত পূরণ করার পরে এসেও পান্ডবরা নিজেদের হারানো রাজ্য ফিরে পায় নাহ৷ ধূর্ততা ও কুটিলতা দ্বারা শকুনি ও দুর্যোধন এবারেও বঞ্চিত করার চেষ্টা করে। কিন্তু শর্ত পূরণ করার কারণে রাজ্য ফেরত পাওয়ার নৈতিক অধিকার পান্ডবদের ছিল।
নিজেদের রাজ্য প্রাপ্তির জন্য পঞ্চ পাণ্ডব কখনো যুদ্ধ বা সংঘাতকে বেছে নিতে চায়নি। বরং, ধার্মিক পান্ডবদের ছিল এই ভাতৃঘাতী যুদ্ধ এড়িয়ে চলার প্রয়াস। সেজন্য, পান্ডবদের পক্ষ থেকে রাজ্য নয় বরং পঞ্চ ভ্রাতার জন্য ০৫টি গ্রাম চাওয়া হয়। কিন্তু দুর্যোধন এর লক্ষ্য ছিল যুদ্ধ। ফলস্বরূপ, দুর্যোধন বর্তমানে প্রচলিত যুদ্ধবাজ দেশের নেতাদের ন্যায় ঔদ্ধত্যের সঙ্গে গর্জে উঠে বললেন, "বিনা যুদ্ধে নাহি দেব সূচাগ্র মেদিনী" যার অর্থ যুদ্ধ না করে তিনি পাণ্ডবদেরকে সূচের ডগায় যতখানি মাটি ধরে, ততটুকু জমিও দেবেন না। মহাভারতের উদ্যোগ পর্বে বর্ণিত এই বাক্যই যথেষ্ট উপলব্ধির জন্য যে, কেন মহাভারতের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ এড়ানো যায়নি। শ্রদ্ধেয় মুক্তচিন্তক রাজিবুর উল্লেখ্য যে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে আপনি গণহত্যার প্ররোচক রুপে সম্বোধন করেছেন কিন্তু তিনি নিজের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করেছিলেন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ রোধ করার জন্য। নিজে শান্তিদূত হয়ে, হস্তিনাপুরে পৌঁছে দু'পক্ষের মধ্যে শান্তিপ্রতিষ্ঠায় চেষ্টা চালিয়ে যান। কিন্তু, গুরুদ্রোণ এর অন্ধ সন্তান প্রেম, লোভী কর্ণ ও হস্তিনাপুরের রক্ষক ভীষ্মের মতো যোদ্ধার উপর অবিচল আস্থা তার ঔদ্ধত্যের সীমা পেরিয়ে যেতে সহায়তা করে। ফলস্বরূপ, শান্তিদূত ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে তিরস্কার ও অমর্যাদা এবং অসম্মানিত করে বন্দী করার চেষ্টা করেন। এই পরিস্থিতিতে আপনার কর্তব্য কি হতো?
একজন প্রকৃত বিচক্ষণ ব্যক্তি যুদ্ধকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে, কুটনীতির মাধ্যমে সে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেন। কিন্তু যখন কুটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, তখন যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠে। উদাহরণস্বরূপ, ১ম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বে যুদ্ধবাজ জার্মানির রাজা দ্বিতীয় উইলহেমের (Kaiser Wilhelm II) সাথে বিভিন্ন দেশের মধ্যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলেছিল। কিন্তু দ্বিতীয় উইলহেম এর একরোখা যুদ্ধ উন্মাদনা ও জুলাই সংকটের (July Crisis of 1914) সে সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়। ফলস্বরূপ, ১ম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। যা মানব ইতিহাসের প্রলয়ঙ্কারী বিপর্যয় নিয়ে আসে এবং জার্মানিকে দেয় ধ্বংসাত্মক পরাজয়। ২য় বিশ্বযুদ্ধেও হিটলারের তীব্র আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধকৌশল অবলম্বন না করে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের নেতৃবৃন্দ তোষণ নীতি (Appeasement Policy) অনুসরণ করে মিউনিখ চুক্তি (Munich Agreement - ১৯৩৮) করে। কিন্তু হিটলারের দাম্ভিকতা যুদ্ধকে বেছে নেয় এবং চুক্তি ভঙ্গ করে। ফলশ্রুতিতে, ইতিহাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। তবে ইতিহাসবিদগণ এই কুটনৈতিক প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন। এই দৃষ্টান্ত গুলো কখনো, মহাভারতের সঙ্গে তুলনা করা যায় নাহ। কিন্তু যুদ্ধ এড়ানোর প্রয়াসের জন্য পূর্বোক্ত সূত্র বিশ্লেষণ করা।
কিন্তু কেন মহাভারতের সাথে বিশ্বযুদ্ধের তুলনা অমূলক? কারণ উদ্দেশ্য। মহাভারতের উদ্দেশ্য ছিল ধর্ম, ন্যায়, সত্যের পক্ষে এবং কখনো প্রতিশোধমূলক নয়। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উভয় পক্ষ ছিলেন আগ্রাসন, সাম্রাজ্যবাদী এবং শোষকদের প্রতিভূ। সেখানে, বিশ্বকে দখলদারিত্বের অভিলাষে উন্মুক্ত রণাঙ্গনে পরিণত করা হয়েছিলো। সেখানে ছিল নাহ নৈতিকতা, ছিল নাহ কোনো সত্য। নাৎসি বাহিনী যুদ্ধে যেমন শত্রু সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়েছিল, তেমনি নিজ দেশের ইহুদি গণহত্যার মূল দোষী ছিল। একইভাবে জাপানের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বলি হতে হয়েছে চীনের নানজিং, চাংজিয়াও, ফিলিপাইনের ম্যানিলা, সিঙ্গাপুরের লক্ষ লক্ষ মানুষদের। অন্যান্য বহু প্রান্তে চালানো হয়েছে গণহত্যা। কিন্তু সে সকল গণহত্যার শিকার ছিল সাধারণ মানুষ।
কিন্তু বিপরীতে মহাভারতে যুদ্ধে দু'পক্ষের মিত্র ও তাদের সৈন্যবাহিনী যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। সেখানে ছিল বিধিবদ্ধ নিয়ম, নিরস্ত্র যোদ্ধার উপর আক্রমণ না করা, রথচালককে আক্রমণ না করা। কিন্তু কোনো সাধারণ নাগরিকদের প্রতি কোনো আগ্রাসনের উল্লেখ নেই।
উপরোক্ত বিশ্লেষণ থেকে এটা স্পষ্ট যে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিলেন যুদ্ধ এড়িয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করার। কিন্তু চরম অপমান, অপদস্ত হয়ে ফিরে আসতে হয়েছে। সেইসাথে দুর্যোধন এর মুখে জার্মানির রাজা দ্বিতীয় উইলহেমের মতো সেই যুদ্ধবাজ দম্ভোক্তি। এরূপ ক্ষেত্রে, কোনো উপায়ন্তর যেমন ছিল না বিশ্বযুদ্ধ এড়ানোর, তেমনি কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ এড়ানো যায়নি।
শ্রীমদ্ভগবদগীতা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অমৃত জ্ঞান। এই জ্ঞান সকলের মাঝে জীবনের এক অনন্য দর্শন উপস্থাপন করে। একজন যোদ্ধা রুপে এই জ্ঞান আমাদের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় কিন্তু একজন সাধারণ ব্যক্তি হিসেবে আবার ভক্তি ও প্রেমের জ্ঞান শোনায়। একজন যোদ্ধার সম্মুখে যখন যুদ্ধ অনিবার্য, তখন সে কাপুরুষের ন্যায় পৃষ্ঠ প্রদর্শন করতে পারে নাহ। সে পারে নাহ, তার যোদ্ধা হিসেবে ধর্মকে ভুলে যেতে। কিন্তু অর্জন বিমর্ষ মনে সে কাপুরুষোচিত আচরণের বহিঃপ্রকাশ করছিলেন, কিন্তু জীবন মার্গের সঠিক দিকনির্দেশক হিসেবে অর্জুনকে দেখালেন প্রকৃত পথ। জার্মানির হিটলার অর্জুনের মতো কোনো সত্য অসত্য, ন্যায় অন্যায় কিংবা জনগণের হয়ে লড়াই করেনি। বরং, ক্ষমতার লোভ, সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের অভিলাষে উগ্র জাতীয়তাবাদ দ্বারা হত্যা করেছে লাখো জনতা।
ফ্রিডরিখ নীৎসের সঙ্গে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের তুলনা সত্যি হাস্যকর ও দুঃখজনক। ফ্রিডরিখ ভিলহেল্ম নিৎশে (Friedrich Wilhelm Nietzsche) ছিলেন একজন জার্মান দার্শনিক, কবি ও ভাষাতত্ত্ববিদ। নিজ জীবনে উগ্র এবং শূন্যবাদী দার্শনিক হিসেবে পরিচিত এই ব্যক্তি নাস্তিকতা এবং দৃষ্টিভঙ্গিবাদ প্রচার করেন। নিজের এই উগ্র চিন্তা জার্মানদের নামিয়েছিল মৃত্যুর মিছিলে কিন্তু তিনি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মতো শান্তিপ্রতিষ্ঠা ও সত্যের মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়ার ধারণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন নাহ। বরং, তিনি উগ্র জাতীয়তাবাদী ও নাস্তিকতাকে লালন করেছিলেন এবং ঘোষণা করেছিলেন "ঈশ্বর মৃত এবং আমরাই তাকে হত্যা করেছি।" তিনি এই ধারণা কোনো ভারতীয় দর্শন এর বিরুদ্ধ হিসেবে প্রচলন করেননি বরং সাম্রাজ্যবাদ বিস্তারের নামে আফ্রিকার কালো মানুষদের ধর্মমতের নামে অত্যাচার করা হচ্ছিল তখন এই বিষয়ের বিরোধিতা করে বলেছিলেন। কিন্তু হিটলার কি সে ধারণার সাথে যুক্ত ছিলেন। নাহ! হিটলার মহাশয় নিজের প্রোপাগাণ্ডা তত্ত্ব দ্বারা লক্ষ লক্ষ মানুষদের হত্যা করেছিলেন। কিন্তু মহাবীর অর্জুন কি হিটলারের মতো গনহত্যায় উন্মত্ত হয়েছিলেন? অবশ্যই নাহ। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও যখন ব্যর্থ হলেন, তখন তিনি একজন যোদ্ধার দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিলেন। এটা কিভাবে Friedrich Wilhelm Nietzsche এর মতো ব্যক্তির সাথে তূল্য হতে পারে ⁉️
মুক্তমনা সাহেব, আপনি বললেন গৌতম বুদ্ধ হলে বিকল্প ব্যবস্থা করতেন। সত্যি! সকল সমস্যার সমাধান যদি শুধু বাক্য দ্বারা হতো তবে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বাঙালিদের স্বাধীনতা যুদ্ধে লিপ্ত হতে হতো নাহ। এই বোধটুকুও যদি হারিয়ে যায়, তবে চিন্তাবিদ হিসেবে ব্যর্থতা স্পষ্ট। গৌতম বুদ্ধের অহিংস বাণী অবশ্যই শ্রদ্ধেয়, কিন্তু সম্মুখে কেউ অস্ত্র হাতে আপনার হানি করতে অগ্রগামী হলে, আপনার স্ত্রীর দিকে অগ্রসর হলে শুধু অহিংস বাণী দ্বারা তাকে রুদ্ধ করতে পারবেন? জ্ঞান তখনই প্রয়োগ হতে পারে, যদি সে ব্যক্তি তাহার যোগ্য হয়।
বিঃদ্রঃ আমরা আপনার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করি। কিন্তু জ্ঞানের দৈন্যতা হেতু ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সম্পর্কে বিতর্কিত মন্তব্য করা সমুচিত হয়নি। আশা করি, নিজের জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি করে, যেকোনো বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জন করে মতামত প্রকাশ করবেন।
🔎Run with #veda